পর্দা উঠছে বইমেলার: উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ফাইল ছবি
‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শুরু হচ্ছে বাঙালির প্রাণের উৎসব অমর একুশে বইমেলা-২০২৬। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাসব্যাপী এই আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি মেলার উদ্বোধন ঘোষণা করবেন এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫ বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেবেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন বাংলা একাডেমি-এর সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেবেন মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি-র সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা।
এবারের মেলায় মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠানের জন্য মোট ১ হাজার ১৮টি ইউনিট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বছর অংশ নিয়েছিল ৭০৮টি প্রতিষ্ঠান; ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন গাছতলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিনের জন্য স্টল বরাদ্দ রয়েছে। শিশুচত্বরে রয়েছে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ও ১০৭টি ইউনিট।
মেলার বিন্যাস আগের মতো থাকলেও মেট্রোরেল স্টেশনের অবস্থানগত কারণে বাহিরপথ কিছুটা সরিয়ে মন্দির গেটের কাছে নেওয়া হয়েছে। টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্লান্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন অংশে চারটি প্রবেশ ও বাহিরপথ রাখা হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানা ঘেঁষে খাবারের স্টল সুবিন্যস্তভাবে স্থাপন করা হয়েছে। নামাজের স্থান, ধৌতাগারসহ প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা থাকবে। পবিত্র রমজান উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে তারাবি নামাজের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শিকড় আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রোথিত’
মেলা চলবে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। ছুটির দিনে সময়সূচি সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে প্রবেশ করা যাবে না। প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত মূল মঞ্চে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে ‘শিশুপ্রহর’ পালিত হবে; শিশু-কিশোরদের জন্য চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বইমেলায় বাংলা একাডেমি ও অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নির্ধারিত কমিশন নীতি অনুসরণ করবে। বাংলা একাডেমির বই ও পত্রিকা বিক্রির জন্য মেলার দুই অংশেই স্টল থাকবে।
মেলায় বিভিন্ন স্মৃতি পুরস্কার দেওয়া হবে। অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণগত মান বিচারে সেরা বইয়ের প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’ দেওয়া হবে। শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান পাবে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। শিশুতোষ গ্রন্থে গুণগত মানে শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পাবে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’। স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান পাবে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। পাশাপাশি নতুন অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে গুণগত মানে সেরা বইয়ের জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কঠোরতা আরোপ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) মো. সরওয়ার জানিয়েছেন, মেলায় মব পরিস্থিতির কোনো আশঙ্কা নেই, তবে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি থাকবে। প্রবেশ ও বাহিরপথে পর্যাপ্ত আর্চওয়ে, প্রায় ৩০০টি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ক্যামেরা এবং সাদা পোশাকের বিশেষ টিম মোতায়েন থাকবে। পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা, হারানো-প্রাপ্তি কেন্দ্র, মাতৃদুগ্ধপান কর্নার, শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র, প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা ও অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও থাকবে।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা উসকানিমূলক কোনো বই যাতে মেলায় স্থান না পায়, সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। যানজট নিরসনে বিশেষ পথনির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে; মেলা চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ভারী যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না এবং টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সড়ক জনসমাগম বিবেচনায় নিয়ন্ত্রিতভাবে খোলা বা বন্ধ রাখা হবে। দর্শনার্থীদের গেটের আগে নেমে হেঁটে প্রবেশের অনুরোধ জানিয়েছে পুলিশ।
পরিবেশ সুরক্ষায় এবারের আয়োজনকে ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে। স্টল, মঞ্চ, ব্যানার, লিফলেট ও খাবারের দোকানে পাট, কাপড় ও কাগজের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ধূলিবালি নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো, মশক নিধন এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।
রীতি অনুযায়ী ভাষার মাসের প্রথম দিন বইমেলা শুরু হলেও চলতি বছর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও রোজার কারণে ডিসেম্বরে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে তা কয়েক দফা পিছিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। মাসব্যাপী এই আয়োজন ঘিরে রাজধানীতে বইপ্রেমীদের মধ্যে ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








