২৩ বছর পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘ ২৩ বছরের এক অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটতে চলেছে। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক অভিযানের পর থেকে ইরাকের মাটিতে যে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি ছিল, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর তা পুরোপুরি শেষ হতে যাচ্ছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির কার্যালয় এবং মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর মাধ্যমে ইরাকের সার্বভৌমত্ব রক্ষার নতুন এক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে দেশটি, যেখানে সামরিক সম্পর্কের পরিবর্তে প্রাধান্য পাবে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব।
ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বুধবার (১২ আগস্ট) প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরাকে আইএস-বিরোধী বৈশ্বিক জোটের অভিযানের সমাপ্তি হতে চলেছে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে সব বিদেশি সেনা প্রস্থান করবে। এই সময়সীমা চূড়ান্ত এবং নির্ধারিত।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, আগামী ১ অক্টোবর ইরাকের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন হতে যাচ্ছে, কারণ সেই দিন থেকে ইরাকের মাটিতে আর কোনো বিদেশি সেনার উপস্থিতি থাকবে না। গত জুলাই মাসের মাঝামাঝি ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সেন্টকমের কমান্ডার জেনারেল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন, তখনই মূলত এই চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পেছনের প্রেক্ষাপটটি বেশ জটিল ও ঘটনাবহুল। ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করতে মার্কিন বাহিনী ইরাকে আগ্রাসন শুরু করেছিল। অভিযানের ৯ মাসের মাথায় সাদ্দাম হোসেন গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাত্ত্বিকভাবে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পরপরই মার্কিন বাহিনীর ইরাক ত্যাগের কথা ছিল। কিন্তু সে সময় ইরাকে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসের (ISIS) উত্থান ঘটে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং আইএসকে নির্মূল করার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন সেখানে দীর্ঘমেয়াদে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাকি সেনাবাহিনী আইএস দমনে যথেষ্ট সক্ষমতা অর্জন করায় এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় আর সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউসে প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সঙ্গে বৈঠকের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করেন যে, ইরাকে এখন আর মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে তিনি ইরাকের তেল ও গ্যাস খাতের বিশাল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন: কলম্বিয়ার ধ্বংসস্তূপে নবজাতকের কান্না, ৪৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার
ট্রাম্প বলেন, আমরা অনেক চুক্তি করব, যা উভয় দেশের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং আমরা বিপুল পরিমাণ তেল উত্তোলনের দিকে নজর দেব।
এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের অংশ হিসেবেই সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি ইরাকে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সরব উপস্থিতির চিত্র ফুটে উঠছে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সেনা প্রত্যাহারের এই পরিকল্পনা ইরান-সমর্থিত স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়ার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। আলী আল-জাইদি জানিয়েছেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর রাষ্ট্রের বাইরে কোনো গোষ্ঠীকে অস্ত্র বহনের অনুমতি দেওয়া হবে না। এই নিরাপত্তার নিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটেই মূলত ওয়াশিংটন সফরে প্রধানমন্ত্রীর মূল লক্ষ্য ছিল ইরাকের তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের মার্কিন বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইরাক সরকার, মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট শেভরন, টিআই ক্যাপিটাল এবং কাতারের ইউসিসি একটি বিশাল প্রকল্পে চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় বসরা থেকে হাদিথা হয়ে তুরস্ক ও সিরিয়ার বন্দর পর্যন্ত দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনে সক্ষম একটি বৃহৎ পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
পেন্টাগনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শেষ করার লক্ষ্যে ২০২৪ সালে সম্পাদিত একটি চুক্তির অংশ হিসেবেই এই সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া চলছে।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে সূত্রে জানা যায়, একসময় ইরাকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা আইএস-বিরোধী অভিযানে মোতায়েন থাকলেও, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। ইরাকি প্রধানমন্ত্রী ও মার্কিন প্রশাসনের এই সমন্বিত সিদ্ধান্তের ফলে এখন থেকে দুই দেশই একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে মনোনিবেশ করবে। ২৩ বছর পর বিদেশি সেনামুক্ত ইরাক এখন তার তেলসম্পদ ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার স্বপ্ন দেখছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, ডয়চে ভেলে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








