৩৫৮ কিমি এমআরএলএস পরীক্ষায় শক্তি প্রদর্শন কিম জং উনের
ছবি: সংগৃহীত
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিল উত্তর কোরিয়া। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি ২০২৬) দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি অত্যাধুনিক দূরপাল্লার, বড় ক্যালিবারের ও প্রযুক্তিগতভাবে আপগ্রেড করা বড় ক্যালিবারের মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সিস্টেমের (এমআরএলএস) সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি’ (কেসিএনএ)।
কেসিএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার ‘মিসাইল প্রশাসন’ নতুন প্রযুক্তিতে উন্নীত করা এই অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করতে পরীক্ষাটি পরিচালনা করে। পরীক্ষার অংশ হিসেবে চারটি রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়, যা উৎক্ষেপণস্থল থেকে প্রায় ৩৫৮ থেকে ৩৫৮.৫ কিলোমিটার দূরে পূর্ব সাগরের পানিসীমায় নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানে।
পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ শেষে কিম জং উন এই নিক্ষেপণকে উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত প্রতিরোধ সক্ষমতা আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন।
তার দাবি, সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এই এমআরএলএসের আঘাত হানার ক্ষমতা ও নির্ভুলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, অন্তত আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অন্য কোনো দেশ এ ধরনের প্রযুক্তি বা সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে না।
কিম জং উন আরও দাবি করেন, এই পরীক্ষার ফলাফল পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সামরিক সংঘাত চাওয়া শক্তিগুলোর জন্য একটি ‘গুরুতর হুমকি’ তৈরি করবে। একই সঙ্গে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, নির্ভরযোগ্য আক্রমণাত্মক সক্ষমতা গড়ে তোলা ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার নীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
কেসিএনএ জানায়, আসন্ন ওয়ার্কার্স পার্টি অব কোরিয়ার নবম কংগ্রেসে দেশের পারমাণবিক যুদ্ধ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও জোরদার করার পরবর্তী ধাপের পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই কংগ্রেসে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতের জন্য নতুন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন কিম জং উন।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষিত এমআরএলএসটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
কিম জং উন জানিয়েছেন, এই অস্ত্র ব্যবস্থায় রকেটের গতিশীলতা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আঘাতের নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশেষ করে এর ‘স্বয়ংক্রিয় প্রিসিশন গাইডেন্স ফ্লাইট সিস্টেম’ বা নিজস্ব নির্দেশিত উড্ডয়ন প্রযুক্তিকে তিনি উত্তর কোরিয়ার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পের হুমকির জবাবে তেহরানের হুঁশিয়ারি
প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, এই সামরিক মহড়ায় কিম জং উনের সঙ্গে তার কন্যা কিম জু-এ এবং মিসাইল প্রশাসনের প্রধান জ্যাং চ্যাং-হা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কিম জু-এর উপস্থিতি উত্তরাধিকার ও ক্ষমতার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত বহন করে। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, কিম যে ‘সেলফ-স্টিয়ার্ড’ বা স্বয়ংক্রিয় নির্দেশিত প্রযুক্তির কথা বলেছেন, তা রাশিয়ার সহায়তায় প্রাপ্ত সামরিক গ্রেডের জিপিএস সিস্টেম হতে পারে, যা শত্রুপক্ষের জিপিএস জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্নিত করার প্রচেষ্টা এড়াতে সক্ষম।
বিশ্লেষকদের মতে, ৬০০ মিলিমিটার ব্যাসের এই রকেট লঞ্চারগুলোর সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার, যা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিকেই এর আওতায় নিয়ে আসে।
এই পরীক্ষা এমন এক সময়ে চালানো হলো, যখন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মঙ্গলবার জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া পূর্ব সাগরের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে এটি উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ। একই দিনে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী পিয়ংইয়ংয়ের উত্তরাঞ্চল থেকে পূর্ব সাগরের দিকে ছোড়া একাধিক স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল শনাক্ত করার কথাও জানায়।
এই সামরিক শক্তি প্রদর্শনটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি এলব্রিজ কোলবির দক্ষিণ কোরিয়া সফরের সময়ের সঙ্গেও মিলে গেছে। সিউলের পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরির প্রচেষ্টা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনার ঠিক পরেই এই পরীক্ষা হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এটিকে পিয়ংইয়ংয়ের একটি ‘পেশিশক্তি প্রদর্শন’ হিসেবে দেখছেন।
উত্তর কোরিয়ার ধারাবাহিক অস্ত্র পরীক্ষা কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে এসব পরীক্ষার নিন্দা অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: এনকে
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








