মাদুরোর দুর্গ জয়: সিআইএকে তথ্য দেয়া কে সেই ‘গাদ্দার’?
ছবি: সংগৃহীত
চলতি মাসের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। দুর্গের মতো সুরক্ষিত প্রেসিডেন্সিয়াল বাসভবন থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে এ অভিযান সফল হওয়ায় শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে—ভেতরের সহায়তা ছাড়া এমন অভিযান আদৌ সম্ভব ছিল কি না।
এই প্রশ্নের আংশিক জবাব আসে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
রয়টার্স জানায়, অভিযানের সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে মাদুরোর ঘনিষ্ঠ এক বিশ্বাসঘাতক, যিনি নিয়মিতভাবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএকে মাদুরোর অবস্থান ও নিরাপত্তা কাঠামো সংক্রান্ত গোপন তথ্য সরবরাহ করছিলেন। তবে সেই ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, ফলে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা আরও ঘনীভূত হয়।
এই জল্পনার মধ্যেই শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রয়টার্স প্রকাশ করে নতুন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদুরোকে আটক করার অভিযানের কয়েক মাস আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলোর সঙ্গে গোপন যোগাযোগ শুরু করে এবং অভিযানের পরও সেই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ৬২ বছর বয়সী কাবেলোকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সতর্ক করে জানিয়েছিল—তার অধীনস্থ নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের ব্যবহার করে যেন বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো না হয়। কাবেলোর নিয়ন্ত্রণাধীন কাঠামোর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লক্ষণীয় যে, গত ৩ জানুয়ারির মার্কিন অভিযানের পরও এসব বাহিনী বড় কোনো রদবদল ছাড়াই কার্যকর রয়েছে।
যে মাদক পাচার মামলায় যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে আটক করেছে, সেই একই মামলায় অভিযুক্ত কাবেলোও। তা সত্ত্বেও অভিযানের সময় তাকে বন্দি করা হয়নি।
রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রত্যাবর্তনের পরপরই কাবেলোর সঙ্গে এই যোগাযোগ শুরু হয় এবং মাদুরোকে অপসারণের ঠিক আগের সপ্তাহগুলোতেও তা চলমান ছিল। এমনকি মাদুরো অপসারণের পরও যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বলে চারটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলা থেকে প্রথম চালানেই ৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি যুক্তরাষ্ট্রের
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ভেতরের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই যোগাযোগ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, কাবেলো যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনী পুরোপুরি মাঠে নামান, তাহলে দেশজুড়ে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের পক্ষে ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কাবেলোর আলোচনায় ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কাবেলো প্রকাশ্যে ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন।
যদিও বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু রদ্রিগেজ হলেও বাস্তবে সেই পরিকল্পনা সফল বা ব্যর্থ করার ক্ষমতা এখনো কাবেলোর হাতেই রয়েছে।
রয়টার্সের একটি সূত্র জানায়, কাবেলো সরাসরি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
এ বিষয়ে হোয়াইট হাউজ ও ভেনেজুয়েলা সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
দিয়োসদাদো কাবেলো দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে তার উত্থান ঘটে এবং পরে নিকোলাস মাদুরোর বিশ্বস্ত সহযোগী ও দমননীতির প্রধান প্রয়োগকারী হিসেবে পরিচিতি পান। যদিও রদ্রিগেজ ও কাবেলো দীর্ঘ সময় সরকার, আইনসভা ও ক্ষমতাসীন দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলে মনে করা হয়।
সাবেক সেনা কর্মকর্তা কাবেলো সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব বজায় রেখেছেন। তার সঙ্গে সরকারপন্থি সশস্ত্র মিলিশিয়া ‘কোলেকতিভো’দের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে এই বাহিনীগুলো বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল বলেও মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করে।
কাবেলোর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে এক কোটি ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করে এবং তাকে ‘কার্টেল দে লস সোলেস’ নামে পরিচিত মাদক পাচার চক্রের শীর্ষ নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করে। পরবর্তীতে এই পুরস্কারের পরিমাণ বাড়িয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার করা হয়। যদিও কাবেলো সব অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করে আসছেন।
মাদুরো অপসারণের পর ওয়াশিংটনে প্রশ্ন ওঠে—তালিকার দ্বিতীয় শীর্ষ অভিযুক্ত কাবেলোকে কেন আটক করা হয়নি।
এ বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মারিয়া এলভিরা সালাজার মন্তব্য করেন, কাবেলো মাদুরোর চেয়েও বেশি ভয়ংকর হতে পারেন।
অন্যদিকে, কাবেলো যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ‘ভেনেজুয়েলা আত্মসমর্পণ করবে না।’ তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে তল্লাশির সংখ্যা কমে এসেছে।
একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ও ভেনেজুয়েলা সরকার জানিয়েছে, রাজনৈতিক বন্দিদের একটি অংশ মুক্তি পাবে।
সরকারের দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এই মুক্তি প্রক্রিয়ার তদারকি করছেন কাবেলো নিজেই। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, মুক্তির গতি অত্যন্ত ধীর এবং এখনো শত শত মানুষ অন্যায়ভাবে বন্দি রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং তেলসমৃদ্ধ দেশটির সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র কাবেলোর মতো মাদুরো-ঘনিষ্ঠ নেতাদের ওপর নির্ভর করছে। তবে তার দমনমূলক অতীত এবং ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকিও তৈরি করছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ডেলসি রদ্রিগেজ ইতোমধ্যে নিজের ক্ষমতা সংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অনুগতদের বসাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে তেল উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলা বিষয়ে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এলিয়ট আব্রামস রয়টার্সকে বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটাতে হলে একপর্যায়ে কাবেলোকে ক্ষমতা থেকে সরানো হবে—এমন প্রত্যাশা অনেক ভেনেজুয়েলাবাসীর রয়েছে।
তার ভাষায়, যেদিন কাবেলো বিদায় নেবেন, সেদিনই মানুষ বুঝবে যে প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








