হেগে শুরু হলো রোহিঙ্গা গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ শুনানি
ছবি: সংগৃহীত
রাখাইনের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা ঐতিহাসিক মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হয়েছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে)।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত পিস প্যালেসে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় এই শুনানি শুরু হয়, যা টানা তিন সপ্তাহ ধরে চলবে।
গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই প্রথম কোনো গণহত্যা সংক্রান্ত মামলা, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে পূর্ণাঙ্গ শুনানির পর্যায়ে পৌঁছাল। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার বিচারিক ফলাফল কেবল মিয়ানমারের জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক পরিসরেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যা মামলাসহ অন্যান্য চলমান আন্তর্জাতিক মামলার ক্ষেত্রেও এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র গাম্বিয়া ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের আওতায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করে।
অভিযোগে বলা হয়, মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে।
গণহত্যা সনদ অনুযায়ী, গণহত্যা বলতে এমন কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়, যার লক্ষ্য কোনো জাতিগত, ধর্মীয় বা বর্ণগত গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করা।
মামলার পটভূমিতে রয়েছে ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর পরিচালিত একটি ভয়াবহ সামরিক অভিযান। ওই অভিযানের ফলে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা তাদের বসতভিটা ছেড়ে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নির্বিচার হত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধের বর্ণনা দিয়েছেন।
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন তদন্ত শেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ২০১৭ সালের ওই সামরিক অভিযানে ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
আরও পড়ুন: নিজেকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলেন ট্রাম্প!
তবে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে আসছে, তাদের অভিযান ছিল মুসলিম উগ্রবাদীদের হামলার জবাবে পরিচালিত একটি বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ।
আইসিজেতে মামলার প্রাথমিক শুনানিতে ২০১৯ সালে মিয়ানমারের তৎকালীন নেত্রী অং সান সু চি ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে গাম্বিয়ার আনা অভিযোগগুলোকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করেন এবং গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। সামরিক জান্তা সু চি ও তার দলের বহু নেতাকে আটক করে কারাগারে পাঠায়। এর জেরে দেশজুড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, যা বর্তমানে গৃহযুদ্ধের রূপ নিয়েছে।
এই পূর্ণাঙ্গ শুনানির একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক আদালত সরাসরি রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করতে যাচ্ছে। শুনানিতে তিনজন রোহিঙ্গা সাক্ষ্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সাক্ষ্য প্রদানের আগে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিং।
সোমবার ঢাকায় অবস্থিত কানাডিয়ান হাইকমিশনের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বৈঠকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলমান নিপীড়ন, সহিংসতা, অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা আইসিজের মামলায় ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে সহায়তার জন্য কানাডার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। হাইকমিশনার অজিত সিং সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসার সাহসিকতার জন্য তাদের প্রশংসা করেন এবং মানবাধিকার, জবাবদিহিতা ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতি কানাডার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, এই মামলাটি গণহত্যাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, কীভাবে তা প্রমাণ করা যাবে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এর প্রতিকার কী হতে পারে—এসব বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে।
তবে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, সংবেদনশীলতা ও গোপনীয়তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এই শুনানির অধিবেশনগুলো জনসাধারণ ও গণমাধ্যমের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়নি। তিন সপ্তাহব্যাপী এই শুনানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এক ঐতিহাসিক বিচারিক প্রক্রিয়ার সাক্ষী হতে যাচ্ছে, যার রায় ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক গণহত্যা মামলাগুলোর জন্য পথনির্দেশক হয়ে উঠতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








