News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৩৮, ৯ জানুয়ারি ২০২৬
আপডেট: ২০:৩৯, ৯ জানুয়ারি ২০২৬

আন্তর্জাতিক আইন নয়, নিজস্ব নৈতিকতায় ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি

আন্তর্জাতিক আইন নয়, নিজস্ব নৈতিকতায় ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি

ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব ‘নৈতিকতা’ ও ‘পাশবিক শক্তি’ (Brute Force) ব্যবহারের মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দী করার প্রেক্ষাপটে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই বিতর্কিত অবস্থান ব্যক্ত করেন।

ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় এবং আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নে তিনি কোনো আন্তর্জাতিক সনদের তোয়াক্কা করবেন না। 

আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা উচিত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। বিষয়টি নির্ভর করছে আপনি এর সংজ্ঞা কীভাবে দিচ্ছেন তার ওপর। আমি মানুষকে আঘাত করতে চাই না, লক্ষ্য অর্জনে আমার নিজস্ব নৈতিকতাই যথেষ্ট। তবে প্রয়োজন হলে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করবেন না তিনি।

এই ঘোষণার প্রেক্ষাপটে গত শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়। রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায় এবং অভিযান শেষে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে মার্কিন সেনারা। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এটিকে জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। 

সনদ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ কিংবা বলপ্রয়োগের হুমকি দেওয়া বৈধ নয়।

ভেনেজুয়েলার এই অভিযান ট্রাম্পের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতিকে আরও স্পষ্ট করেছে। হামলার পর ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে ভেনেজুয়েলাকে ‘পরিচালনা’ করবে এবং দেশটির বিশাল তেল সম্পদ ব্যবহার করবে। 

যদিও হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, তবু নীতি প্রণয়ন এবং নির্দেশনার চূড়ান্ত ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকবে। 

আরও পড়ুন: কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকি ‘বাস্তব’: পেত্রো

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনা মেনে চলেন না, তবে তাকে মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

ভেনেজুয়েলার পর ট্রাম্পের দৃষ্টি সীমান্তবর্তী দেশ কলম্বিয়ার দিকে। তিনি কলম্বিয়ার বামপন্থি প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবার ইঙ্গিত দিয়েছেন। এছাড়া ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা জোরদার করেছেন। এর আগে জুন মাসে তিনি ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দিয়ে সরাসরি যুদ্ধবেগে যুক্ত হয়েছেন। 

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে পশ্চিম গোলার্ধে নিজের স্বার্থ রক্ষায় ‘নিঃসংকোচে’ সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।

বিশ্বজুড়ে বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক ইয়াসরা সুয়েদি আল–জাজিরা বলেন, এই ধরনের অবস্থান অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত। এর ফলে চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলোও তাইওয়ান বা ইউক্রেন ইস্যুতে একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত হতে পারে। 

জাতিসংঘের বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার মার্গারেট স্যাটারথওয়েট বলেন, আন্তর্জাতিক আইনকে অগ্রাহ্য করা মার্কিন বক্তব্যগুলো “অত্যন্ত বিপজ্জনক” এবং এটি বিশ্বকে পুনরায় সাম্রাজ্যবাদের যুগে ঠেলে দিতে পারে।

নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়ান হার্ড লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের শতাব্দীব্যাপী হস্তক্ষেপের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, পানামা, হাইতি, নিকারাগুয়া ও চিলি–এর উদাহরণ দেখায়, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের হস্তক্ষেপ পরে অনুশোচনার জন্ম দিয়েছে এবং কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনেনি।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্যও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য গৃহীত চুক্তি, জাতিসংঘ কনভেনশন ও বহুপাক্ষিক সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের একপাক্ষিক নীতি ও সামরিক পদক্ষেপ এই বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়