‘চুরি করা গম’ আমদানির অভিযোগে নিষেধাজ্ঞার মুখে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
ইউক্রেনের নয়াদিল্লি দূতাবাসের শীর্ষ কূটনীতিক ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি ওলেক্সান্ডার পোলিশচুক জানিয়েছেন, রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল থেকে ‘চুরি করা’ গম বাংলাদেশে আমদানি হচ্ছে বলে কিয়েভের কাছে স্পষ্ট তথ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সতর্কতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এই আমদানি বন্ধ না করায়, ইউক্রেন এখন বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছে নিষেধাজ্ঞার জন্য আনতে যাচ্ছে।
২০১৪ সাল থেকে রুশ সেনারা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তৃত কৃষিভূমি দখল করে রেখেছে। ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের পূর্বেও ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই কৃষি পণ্য ‘চুরি’ করার অভিযোগ করে আসছে। রাশিয়া অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং বলছে, দখলকৃত অঞ্চলগুলো এখন রাশিয়ার অংশ এবং সেখান থেকে উৎপাদিত গম ‘রাশিয়ান গম’ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
নয়াদিল্লির ইউক্রেন দূতাবাস ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চারটি আনুষ্ঠানিক চিঠি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এসব চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে, রাশিয়ার কাভকাজ বন্দর থেকে আসা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি গমের চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা ইউক্রেন দাবি করছে অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল সেভাস্তোপল, কের্চ ও বার্দিয়ানস্ক থেকে সংগৃহীত এবং ‘চুরি করা’ শস্য। প্রতিটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট জাহাজের নাম, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, যাত্রার তারিখ এবং বাংলাদেশে আগমনের আনুমানিক সময়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
১১ জুন পাঠানো সর্বশেষ চিঠিতে বিশেষ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, এই ‘চুরি করা’ গম আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুতর নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হতে পারে, যা শুধু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। এতে মানবিক দুর্ভোগও বৃদ্ধি পাবে বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
রয়টার্সের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ এমন কোনো গম আমদানি করে না যার উৎস রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল থেকে। তিনি স্পষ্টতই ‘চুরি করা গম’ আমদানির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে নিরব রয়েছে।
ইউক্রেনের গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চলের গম নিজস্ব গমের সঙ্গে মিশিয়ে রপ্তানি করছে, যাতে উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়। রুশ বন্দর থেকে চালানো এসব জাহাজের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ‘ছায়া নৌবহর’ (Shadow Fleet), যাদের ওপর ইতোমধ্যে ইইউ ৩৪২টি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: গাঁজায় লাগাম দিলো থাইল্যান্ড
ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির মুখপাত্র আনিতা হিপার বলেছেন, অভিযোগে উল্লেখিত কোনো জাহাজ এখনও নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকলেও, চুরি করা গম পরিবহনের প্রমাণ পেলে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। ইইউর মতে, এই ধরনের কার্যক্রম ইউক্রেনের খাদ্য নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ন করে।
রুশ কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্রিমিয়া বাদে দখলকৃত অঞ্চলগুলো এখন রাশিয়ার অংশ এবং সেখান থেকে উৎপাদিত গম রাশিয়ান গম হিসেবে গণ্য হবে। রুশ গম পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান রুসঅ্যাগ্রোট্রান্স জানায়, ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ছিল রাশিয়ান গমের চতুর্থ বৃহত্তম ক্রেতা।
একজন নাম প্রকাশ না করা রুশ ব্যবসায়ী জানান, রুশ বন্দর থেকে জাহাজে লোড করা গমের উৎপাদন উৎস শনাক্ত করা কঠিন, কারণ এগুলো স্বর্ণ বা হীরা নয়, অর্থাৎ লেবেল বা গঠন দিয়ে উৎস জানা যায় না।
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চল এবং কুকেশিয়ান অঞ্চলের বেশিরভাগ কৃষি জমি ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে।
ইউক্রেনের কৃষি খাত এখনও দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত, যা শস্য, উদ্ভিজ্জ তেল ও তৈলবীজ সরবরাহ করে বৈদেশিক মুদ্রা আনে।
ইউক্রেন গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি বিদেশি জাহাজ আটক করেছে, যাদের বিরুদ্ধে ‘চুরি করা গম পরিবহন’ অভিযোগ রয়েছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শস্য চুরির অভিযোগ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার অংশ।
বাংলাদেশ এই জটিল পরিস্থিতির মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চল থেকে ‘চুরি করা’ গম বাংলাদেশে আমদানির অভিযোগে কিয়েভ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করবে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করলেও, ইউক্রেনের কয়েক দফা সতর্কতার পরও গম আমদানি বন্ধ হয়নি বলে তারা মনে করছে। ইইউ এ বিষয়ে নজর রাখছে এবং প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








