গাঁজায় লাগাম দিলো থাইল্যান্ড
ছবি: সংগৃহীত
তিন বছর আগে গাঁজাকে বৈধ ঘোষণা করে এশিয়ার মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে নজির গড়েছিল থাইল্যান্ড। ২০২২ সালের ৯ জুন থেকে দেশটিতে গাঁজা উৎপাদন, ব্যবহার ও বিক্রি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, যা পর্যটন ও কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে আসক্তি, অবাধ সেবন ও পাচারের অভিযোগে এবার নীতিগতভাবে পেছনের পথে হাঁটছে দেশটির সরকার।
গত মঙ্গলবার (২৪ জুন) থাই স্বাস্থ্যমন্ত্রী সোমসাক থেপসুয়েতিন এক সরকারি আদেশে জানান, আগামী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশজুড়ে কোনো দোকানে প্রেসক্রিপশন ছাড়া গাঁজা বিক্রি করা যাবে না।
তিনি আরও বলেন, গাঁজার ফুলকে আবার ‘নিয়ন্ত্রিত ভেষজ’ হিসেবে শ্রেণিকরণের প্রস্তাব দিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, যার অর্থ এটি ওষুধ ছাড়া ব্যবহারযোগ্য থাকবে না।
পরদিন, ২৫ জুন, মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের মহাসচিব ফানুরাত লুকবুন জানান, নতুন বিধান কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যদিও এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি, সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী আগস্টের মধ্যেই এই বিধান পূর্ণরূপে কার্যকর হতে পারে।
থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনেও গাঁজাকে ঘিরে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ফেউ থাই পার্টি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে গাঁজাকে পুনরায় অপরাধ হিসেবে ঘোষণার অঙ্গীকার করেছিল। তবে জোটসঙ্গী ভুমজাইথাই পার্টি—যারা ২০২২ সালে গাঁজা বৈধ করার মূল উদ্যোক্তা ছিল—তাদের বিরোধিতায় এই সিদ্ধান্ত আটকে যায়।
সম্প্রতি দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন শিনাওয়াত্রা এবং কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেন-এর একটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হওয়ার পর রাজনৈতিক চাপের মুখে ভুমজাইথাই পার্টি জোট থেকে সরে যাওয়ার হুমকি দেয়। এর ফলে সরকার গাঁজার ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
থাইল্যান্ডের মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় জানায়, গাঁজা বৈধ হওয়ার পর দেশটিতে আসক্তির হার ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে, সরকার জানায়—গাঁজা বৈধ হওয়ার পর তা বিদেশি পর্যটকদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে পাচার হতে শুরু করেছে, যা দেশের মাদকবিরোধী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সরকারি মুখপাত্র জিরায়ু হউংসাব বলেন, দেশজুড়ে হাজার হাজার দোকানে গাঁজা অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে তরুণ প্রজন্ম ও শিশুদের ওপর। অথচ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন।
সরকারি ঘোষণার পরপরই থাইল্যান্ডজুড়ে গাঁজা বৈধকরণের পক্ষে থাকা গোষ্ঠীগুলো প্রতিবাদে নামে। সামাজিক মাধ্যমে এবং সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি জানায়, এ পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং থাইল্যান্ডের কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবে।
গাঁজা-পন্থী সংগঠনগুলোর জোট “হাই থাই নেটওয়ার্ক” আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামনে গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
সংগঠনটির মুখপাত্র এক বিবৃতিতে জানান, গাঁজা আবার অপরাধ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলে, লক্ষ লক্ষ কৃষক ও উদ্যোক্তা পথে বসবেন। সরকারকে ভাবতে হবে, এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নও।
২০২২ সালে গাঁজা বৈধকরণ থাইল্যান্ডের জন্য এক দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত ছিল। তবে মাত্র তিন বছরের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনায় যাচ্ছে দেশটি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বৈধকরণের ইতিবাচক দিক যেমন পর্যটন ও বিনিয়োগ প্রবাহ, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাবও গভীরভাবে অনুধাবন করছে সরকার।
এখন প্রশ্ন উঠছে—থাইল্যান্ড কি গাঁজাকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে আবার ‘মাদক’ তালিকায় ফেরত নেবে, নাকি কেবলমাত্র চিকিৎসাগত ব্যবহারে সীমাবদ্ধ রাখবে?
আগামী মাসের বিক্ষোভ ও সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে। তবে এটুকু নিশ্চিত—গাঁজা নিয়ে থাইল্যান্ডে বিতর্কের শেষ এখনও হয়নি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








