News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:২৫, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬

চালু হতেই আবার বন্ধ বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্র

চালু হতেই আবার বন্ধ বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক কেন্দ্র

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর জাপানের নিগাতা প্রদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘কাশিওয়াজাকি-কারিওয়া’-এর পুনরুত্থান প্রক্রিয়া আবারও হোঁচট খেয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি (বুধবার) কেন্দ্রটির একটি চুল্লি চালু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কারিগরি ত্রুটির কারণে এর কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো)।

সংস্থাটি জানিয়েছে, সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে কত সময় লাগবে—তা এখনো নিশ্চিত নয়।

২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে জাপান সরকার দেশের সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। সেই সময় থেকেই নিগাতার কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া কেন্দ্রটিও কার্যত অচল ছিল। দীর্ঘ নিরাপত্তা পর্যালোচনা ও সংস্কারের পর জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর ২১ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ২ মিনিটে কেন্দ্রটির ৬ নম্বর চুল্লি পুনরায় চালু করা হয়।

তবে চালু করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই চুল্লির মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় একটি সতর্ক সংকেত বা অ্যালার্ম সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা বিধি অনুসরণ করে সঙ্গে সঙ্গেই কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরদিন ২২ জানুয়ারি টেপকো জানায়, সমস্যার প্রকৃতি নির্ণয়ে সময় লাগবে বুঝতে পেরে পরিকল্পিতভাবেই রিঅ্যাক্টরের কন্ট্রোল রডগুলো পুনরায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির তত্ত্বাবধায়ক তাকেউকি ইনাগাকি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সমস্যাটি এক বা দুই দিনের মধ্যে সমাধান হবে—এমনটি তারা আশা করছেন না। কত সময় লাগবে, তা এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, আপাতত সমস্যার মূল কারণ শনাক্ত করাতেই পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।

টেপকোর মুখপাত্র তাকাশি কোবায়াশি জানান, রিঅ্যাক্টরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং কেন্দ্রের বাইরে কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয় প্রভাব পড়েনি। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কন্ট্রোল রড হলো এমন একটি যন্ত্র, যা রিঅ্যাক্টরের ভেতরে পারমাণবিক বিক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। রড সামান্য তুলে নিলে বিক্রিয়া বাড়ে, আর ভেতরে ঢুকিয়ে দিলে বিক্রিয়া ধীর হয়ে যায় কিংবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

আরও পড়ুন: ‘শান্তি পর্ষদে’ যোগ দিতে কানাডাকে পাঠানো আমন্ত্রণ বাতিল করলেন ট্রাম্প

সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতার দিক থেকে কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিশ্বের সবচেয়ে বড়। কেন্দ্রটিতে মোট সাতটি চুল্লি রয়েছে, যার সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৮ দশমিক ২ গিগাওয়াট। তবে পুনরায় চালুর এই পর্যায়ে সাতটির মধ্যে মাত্র একটি চুল্লিই সক্রিয় করা হয়েছিল।

ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর টেপকোর অধীনে এটিই ছিল কোনো পারমাণবিক চুল্লি পুনরায় সচল করার প্রথম উদ্যোগ। টেপকোই ফুকুশিমা দাইইচি কেন্দ্র পরিচালনা করত, যা বর্তমানে ধাপে ধাপে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

জাপান সরকার বর্তমানে আবার পারমাণবিক শক্তির দিকে ফিরতে চায়। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জন করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া কেন্দ্রের পুনরায় চালু করা নিয়ে নিগাতা প্রদেশে জনমত স্পষ্টভাবেই বিভক্ত।

গত সেপ্টেম্বর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রদেশটির প্রায় ৬০ শতাংশ বাসিন্দা কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আর ৩৭ শতাংশ এর পক্ষে। চলতি মাসের শুরুতে পুনরায় চালুর বিরোধিতা করা সাতটি সংগঠন প্রায় ৪০ হাজার মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদন টেপকো ও জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেয়।

আবেদনে বলা হয়, কাশিওয়াজাকি–কারিওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রটি একটি সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত। অতীতে ২০০৭ সালেও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক যান্ত্রিক ত্রুটি ও সতর্ক সংকেতের ঘটনায় কেন্দ্রটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং টেপকোর কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

টেপকোর আশা ছিল, ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এই চুল্লি থেকে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা যাবে। তবে সর্বশেষ স্থগিতাদেশের পর সেই পরিকল্পনা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা, এএফপি ও দ্য গার্ডিয়ান

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়