বিনোদন ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৫০, ২৭ জুলাই ২০২৬
আপডেট: ১৫:৫০, ২৭ জুলাই ২০২৬

নির্যাতনের অভিযোগে আশিয়ান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিনেত্রীর মামলা

নির্যাতনের অভিযোগে আশিয়ান চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিনেত্রীর মামলা

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকাই চলচ্চিত্রের উদীয়মান মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া এবং তা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর নৃশংস নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে আবাসন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আশিয়ান গ্রুপ ও আশিয়ান ল্যান্ডস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে।

গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাতে রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকার আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভ্যন্তরে অবস্থিত কথিত টর্চার সেলে এই বর্বরতার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় গত ২৬ জুলাই রাতে ভুক্তভোগী অভিনেত্রী নিজেই বাদী হয়ে রাজধানীর খিলক্ষেত থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেছেন।

চলচ্চিত্র অঙ্গনের পরিচিত মুখ স্নিগ্ধা চৌধুরী গত ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রেশার কুকার সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের গসিপ বা বিতর্কের বাইরে থাকা এই অভিনেত্রীকে একটি বিজ্ঞাপনের লোভনীয় কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়। 

মামলার বিবরণে জানা যায়, প্রায় এক বছর ধরে পরিচিত মডেল কো-অর্ডিনেটর ইমনের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকার একটি বিজ্ঞাপন চিত্রের প্রস্তাব পান স্নিগ্ধা। এর মধ্যে ১৭ লাখ টাকা সম্মানী নির্ধারণ করে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা বলে গত ২৪ জুলাই রাত সাড়ে আটটার দিকে তাকে ৩০০ ফিটের পাশের আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেকে নেওয়া হয়।

হাসপাতালে পৌঁছে করিডরের বায়োমেট্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে স্নিগ্ধার মনে সন্দেহ জাগলেও ভেতরে প্রবেশ করার পর আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার মুখোমুখি হন তিনি। এ সময় নজরুলের বিশ্বস্ত অনুচর পলাশ ও ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) মিয়ামীসহ বেশ কয়েকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রাথমিক আলাপচারিতার একপর্যায়ে আকস্মিক উগ্র রূপ ধারণ করেন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি স্নিগ্ধাকে জেবা তাকিয়া নামে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক নারী হিসেবে সম্বোধন করে কোটি টাকা আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগ তোলেন। স্নিগ্ধা বারবার নিজের প্রকৃত পরিচয় এবং উত্তরবঙ্গের বাড়ি উল্লেখ করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও তা আমলে নেননি অভিযুক্ত ব্যবসায়ী।

আরও পড়ুন: পৃথিবীর যেখানেই যাই, বাংলাদেশের খাবারের প্রশংসা করি: আতিফ আসলাম

নজরুল দাবি করেন, স্নিগ্ধা তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং তাকে পুনরায় বিয়ে করতে হবে। এ সময় টেবিলের ওপর ফাঁকা স্ট্যাম্প পেপার রেখে তলোয়ার সদৃশ একটি ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। প্রাণভয়ে এবং চরম আতঙ্কের মধ্যে বাধ্য হয়ে স্নিগ্ধা একটি ভিন্ন নামে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।

চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করার পরও ক্ষান্ত হননি নজরুল। রুম থেকে অন্যান্য সহযোগীদের বের করে দিয়ে স্নিগ্ধাকে বাসর করার জন্য জোরপূর্বক চাপ সৃষ্টি করা হয়। মাসিক (পিরিয়ড) চলার কথা বলে ওই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করলে আরও হিংস্র হয়ে ওঠেন নজরুল। তলোয়ার ও মোটা রশি দেখিয়ে তিনি ভয় দেখান এবং স্নিগ্ধার আইফোনটি কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেন। এরপর শুরু হয় ভয়াবহ মাত্রায় নির্যাতন।

হাত-পা বাঁধন ও শ্বাসরোধ: মোটা রশি দিয়ে প্রথমে স্নিগ্ধার পা এবং পরবর্তীতে সোফায় চেপে ধরে হাত শক্ত করে বাঁধা হয়। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে তিনি প্রতিবাদ জানান, যার ফলে তার ডান গালে সজোরে চড় মারা হয় এবং গলা চেপে ধরা হয়।

শারীরিক প্রহার: সোফায় শোয়ানো অবস্থায় দুটি মোটা লাঠি এনে স্নিগ্ধার দুই পায়ের পাতায় লাগাতার ১৪ বার আঘাত করা হয়। চুল ধরে বসিয়ে ঘাড়ের স্পাইনাল কর্ডের ওপরের অংশে এবং উরু, পিঠ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। এ সময় অভিযুক্তের পা ধরে আকুতি জানালেও তিনি চুল ধরে লাথি মারেন, ফলে অভিনেত্রীর শরীরের বিভিন্ন অংশ ফুলে নীল হয়ে যায়।

বিষাক্ত কফি পান: নজরুলের নারী পিএস মিয়ামীর মাধ্যমে কুসুম গরম কফি স্নিগ্ধার হাতে ঢেলে দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে জোরপূর্বক তাতে নেশাজাতীয় বা বিষাক্ত দ্রবণ মিশিয়ে তা পান করতে বাধ্য করা হয়।

ঘটনার একপর্যায়ে অভিযুক্ত বুঝতে পারেন যে তিনি প্রকৃত জেবা তাকিয়াকে নয়, ভুল করে অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরীকে নির্যাতন করেছেন। এরপর হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়া দরজা খোলা পেয়ে স্নিগ্ধা দ্রুত বারান্দায় গিয়ে নিচে লাফ দেন। সেখান থেকে ৩০০ ফিট রোডে এসে একটি চলন্ত অটোরিকশায় চড়ে তিনি নিরাপদে বাসায় ফেরেন এবং পৌঁছানোর পরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

ঘটনার পর অনুসন্ধানী দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতার প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে। আশিয়ান মেডিকেলের ভেতরে নজরুলের সেই টর্চার সেল, পালানোর বারান্দা, সিসিটিভি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিরাপত্তা বলয়, সেদিন রাতের উবার বুকিংয়ের ডিজিটাল স্লিপ এবং মোবাইল লোকেশনের টাইমলাইনের সঙ্গে ভুক্তভোগীর বর্ণনার হুবহু মিল পাওয়া গেছে।

এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত কো-অর্ডিনেটর ইমনকেও ব্যাপক মারধর করা হয়েছে বলে জানা গেছে; ইমনের স্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে তার পায়ের নখ তুলে নেওয়ার মর্মান্তিক তথ্যও বেরিয়ে এসেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের মতে, নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া দীর্ঘদিন ধরে নিজের ক্ষমতার জোরে এই টর্চার সেলে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন মডেলদের ওপর পাষবিক নির্যাতন চালিয়ে আসছেন।

এই বর্বরোচিত ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও ন্যায়বিচার পাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে গত ২৬ জুলাই রাতে খিলক্ষেত থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করেন স্নিগ্ধা চৌধুরী। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নিবিড় তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে অভিযুক্ত আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়