স্টাফ রিপোর্টার || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:১৪, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশকে ৩৯০ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে কানাডা

বাংলাদেশকে ৩৯০ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে কানাডা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের উন্নয়নে চারটি নতুন উদ্যোগে ৪ কোটি ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার অনুদান ঘোষণা করেছে কানাডা। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) ঢাকার কানাডীয় হাইকমিশন এ তথ্য জানায়।

হাইকমিশন জানায়, গত ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশ সফরকালে এ অনুদানের ঘোষণা দেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই। তাঁর এ সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করা এবং উভয় দেশের জনগণের জন্য উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করা।

সফরকালে বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ, গবেষণা কার্যক্রম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন রণদীপ সারাই। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।

ঘোষিত নতুন অনুদানের মধ্যে বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডাকে দেওয়া হবে ১ কোটি ৮০ লাখ কানাডীয় ডলার। কানাডার কৃষি খাতের উদ্ভাবকদের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করা এ উদ্যোগের লক্ষ্য।

একই পরিমাণ অর্থ, অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ কানাডীয় ডলার পাবে কোওয়াটার ইন্টারন্যাশনাল। এ অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো সহজ করা, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন এবং কানাডাসহ আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কারে অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ এগিয়ে নিতে বিশ্বব্যাংককে ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার অনুদান দেওয়া হবে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশনকে (আইএফসি) দেওয়া হবে আরও ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার।

এই চার উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্ব দিচ্ছে কানাডা।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিনের সঙ্গে বৈঠক করেন রণদীপ সারাই। এসব বৈঠকে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি ও জলবায়ু অর্থায়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বাংলাদেশ, কানাডা ও অন্যান্য অংশীদারের যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব নিয়েও মতবিনিময় হয়।

বাংলাদেশ সফরের অংশ হিসেবে ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করেন কানাডার প্রতিমন্ত্রী। সেখানে কানাডার সহায়তায় তরুণ-তরুণীরা, বিশেষ করে নারীরা, কীভাবে বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন, তা দেখেন তিনি।

কানাডা, ব্র্যাক ও অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তর একটি উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গত পাঁচ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে এ উদ্যোগে ৪ কোটি ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার সহায়তা দিয়েছে কানাডা।

ঢাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) হাসপাতাল পরিদর্শনকালে কানাডার সহায়তায় পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রম সম্পর্কেও অবগত হন রণদীপ সারাই। এসব গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার সাশ্রয়ী ও জীবনরক্ষাকারী সমাধান তৈরি হচ্ছে, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের উপকারে আসছে।

বর্তমানে আইসিডিডিআর,বির প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনায় কানাডা ১ কোটি ৫০ লাখ কানাডীয় ডলার অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া কানাডাই একমাত্র দেশ, যারা প্রতিষ্ঠানটিকে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এ ছাড়া যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গবেষণার জন্য আইসিডিডিআর,বিকে আরও ২ কোটি ৪০ লাখ কানাডীয় ডলার সহায়তা দিয়েছে দেশটি।

সফরের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে গিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন কানাডার প্রতিমন্ত্রী। সেখানে শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য কানাডার সহায়তায় পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি অবগত হন তিনি।

২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য ৬০ কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে কানাডা। এ অর্থ শিক্ষা, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে।

কক্সবাজার সফরকালে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন রণদীপ সারাই। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ, কানাডা ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

এ ছাড়া কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিমিট) একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে গবেষণাভিত্তিক কৃষি কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকেরা কীভাবে ফসলের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন, খাদ্যের চাহিদা পূরণে অবদান রাখছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করছেন, তা পর্যবেক্ষণ করেন। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে উদ্ভাবনী পদ্ধতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সিমিট বায়োএন্টারপ্রাইজ কানাডার সঙ্গে কাজ করবে।

ঢাকায় গিলডান অ্যাকটিভওয়্যার বাংলাদেশ লিমিটেডও পরিদর্শন করেন কানাডার প্রতিমন্ত্রী। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কানাডার বৃহত্তম বিনিয়োগকারী। এ সময় দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

আরও পড়ুন: শনিবার স্বাভাবিক সময়সূচিতে খোলা থাকবে ব্যাংক

কানাডীয় হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশে ৬৩০ কোটি কানাডীয় ডলারের বেশি উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে কানাডা। পাশাপাশি ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০০ কোটি কানাডীয় ডলার ছাড়িয়েছে।

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় নতুন এ অনুদান দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে কানাডা।

বাংলাদেশ সফর শেষে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সারাই।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়