খুলনা সংবাদদাতা || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:৪৬, ১৬ অক্টোবর ২০২৬

সোনার ফসলের বিল ডাকাতিয়া এখন পানির দখলে

সোনার ফসলের বিল ডাকাতিয়া এখন পানির দখলে

ছবি: সংগৃহীত

একসময় যার বুকজুড়ে ঢেউ খেলত সোনালি আমন, বোরো ও আউশ ধানের ক্ষেত, যেখানে সবুজ সবজি, পাট আর ডালের সমারোহে ভরে থাকত পথপ্রান্তর, সেই ঐতিহ্যবাহী বিল ডাকাতিয়া এখন চরম দীর্ঘশ্বাস আর হাহাকারের নাম। দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান খাদ্যভাণ্ডার বলে পরিচিত খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার এই উর্বর জনপদ জলাবদ্ধতার কারণে আজ নিজের রূপ ও অস্তিত্ব হারিয়ে কার্যত এক বিশাল কচুড়িপানা আর শ্যাওলাভরা জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিলে একসময় বছরের বিভিন্ন ঋতুতে ধারাবাহিকভাবে আমন, বোরো এবং প্রচুর পরিমাণে আউশের ফলন হতো। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অতিবৃষ্টির পাশাপাশি নদী-খালগুলোর অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ এবং পলি পড়ে নাব্য হ্রাস পাওয়ার কারণে অঞ্চলটিতে তৈরি হয়েছে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বিল নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান পথ নদী ও খালগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্ষার পানি আর নামতে পারছে না। ফলে বিগত কয়েক বছর ধরে বিলের প্রায় ৩০ হাজার একর চাষাবাদযোগ্য জমির সিংহভাগই বছরের বারো মাসই জলের নিচে তলিয়ে থাকে।

স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী-খালে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা প্রকট হয়েছে। বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকায় কৃষকেরা সময়মতো বীজতলা তৈরি, ধানের চারা রোপণ কিংবা অন্যান্য মৌসুমি ফসল আবাদ করতে পারছেন না। ফলে কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর আয় ও জীবিকা পড়েছে অনিশ্চয়তার মুখে।

বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতার পেছনে কেবল অতিবৃষ্টিই দায়ী নয়; পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হওয়াও সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। নদী ও সংযোগ খালগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে গেলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার সুযোগ কমে যায়। এর সঙ্গে অপরিকল্পিত বাঁধ, খালের প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা এবং পানি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে বর্ষার পানি জমে থাকার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা স্থায়ী হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

আরও পড়ুন: কুমিল্লা সীমান্ত থেকে দুই পুলিশ সদস্যকে ধরে নিয়ে গেল বিএসএফ

এ সংকটের প্রভাব পড়েছে শুধু কৃষিতে নয়, এলাকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও। ফসলি জমি অনাবাদি থাকলে কৃষকের আয় কমে যায়, কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হয় এবং কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন। দীর্ঘদিন জমিতে পানি থাকায় কৃষকেরা প্রচলিত চাষাবাদ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারছেন না। এক মৌসুমের ক্ষতি পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। এভাবে জলাবদ্ধতা দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় কৃষি অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে পানি নিষ্কাশন ও খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। 

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) এক প্রতিবেদনে বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে মতবিনিময় সভার তথ্য প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বৃহত্তর এলাকার নদী-খাল ভরাট, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা এবং কৃষিজমি দীর্ঘদিন অনাবাদি পড়ে থাকার বিষয়ও উঠে আসে। এ থেকে স্পষ্ট, সমস্যাটি মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় মানুষের প্রধান প্রত্যাশা, বিলের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নদী-খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা। এ জন্য পানি নিষ্কাশনের পথগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় খাল ও নদী পুনঃখনন, বাধাগ্রস্ত প্রবাহ সচল করা এবং বাঁধ ও স্লুইসগেটের কার্যকারিতা পর্যালোচনা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এলাকার ভূমির উচ্চতা, পানিপ্রবাহ, জোয়ার-ভাটার প্রভাব ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা পরিকল্পনা প্রণয়নে যুক্ত করা গেলে বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ সহজ হবে।

বিল ডাকাতিয়ার সংকট এখন কেবল কয়েক হাজার একর জমি পানিতে ডুবে থাকার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের জীবিকা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং দীর্ঘদিনের কৃষি ঐতিহ্য। যে বিল একসময় ফসলের প্রাচুর্যে পরিচিত ছিল, সেখানে আবার চাষাবাদের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার কার্যকর পুনর্গঠন এবং পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের বিকল্প নেই। 

স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, যাতে জলাবদ্ধতার অভিশাপ কাটিয়ে বিল ডাকাতিয়ার জমিতে আবারও ফসল ফলানো সম্ভব হয়।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়