নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৪৭, ২৭ মে ২০২৬

হরমুজে অবরুদ্ধ ‘বাংলার জয়যাত্রা’: জাহাজেই ৩১ নাবিকের ঈদ

হরমুজে অবরুদ্ধ ‘বাংলার জয়যাত্রা’: জাহাজেই ৩১ নাবিকের ঈদ

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান তীব্র সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এলাকায় দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে অবরুদ্ধ হয়ে আছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন এই বাল্ক ক্যারিয়ারটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও প্রকৌশলী রয়েছেন। উদ্ভূত যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে জাহাজটি তিন তিনবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে পরিবার-পরিজন ছেড়ে গত ঈদুল ফিতরের পর এবারের ঈদুল আজহাও (২৭ মে) গভীর সমুদ্রে ভাসমান জাহাজেই কাটাতে হয়েছে এই ৩১ নাবিককে। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই উপকূল থেকে প্রায় ২৩ নটিক্যাল মাইল দূরে গভীর সমুদ্রে নোঙর করে থাকা জাহাজটিতেই তারা ঈদের জামাত আদায় করেন। সার্বক্ষণিক মাথার ওপর মিসাইল ও ড্রোন হামলার শঙ্কা এবং দীর্ঘদিন তীরে নামার সুযোগ না থাকায় খাবার ও পানির পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও নাবিকদের মধ্যে একধরনের তীব্র মানসিক ট্রমা ও চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

বিএসসি ও জাহাজ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ১৮০ মিটার দীর্ঘ এই বাল্ক ক্যারিয়ারটি ভারত থেকে পণ্য বহন করে গত ২ ফেব্রুয়ারি হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছিল। এরপর কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। এর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, যার ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং জাহাজটি ওই অঞ্চলেই আটকা পড়ে। পরবর্তীতে গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে পণ্য খালাস সম্পন্ন করার পর, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কুয়েতের একটি বন্দরে নতুন পণ্য বোঝাইয়ের কথা ছিল। তবে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিএসসি কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে জাহাজটিকে নিরাপদ অবস্থানে বা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন ফসফেট সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলেও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: ঈদের প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৭টায়, অংশ নেবেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী

জাহাজটিকে অবরুদ্ধ দশা থেকে বের করে আনার জন্য বিএসসি ও নাবিকেরা দফায় দফায় চেষ্টা চালিয়েছেন। আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধবিরতির আলোচনার সূত্র ধরে গত ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ৫০ মিনিটে জাহাজটি সর্বশেষ বা তৃতীয়বারের মতো হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চূড়ান্ত চেষ্টা চালায়। সৌদি আরবের বন্দর থেকে রওনা দিয়ে প্রায় ৪০ ঘণ্টা একটানা জাহাজ চালিয়ে হরমুজের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ইরান সরকারের কাছে পারাপারের অনুমতি চাওয়া হলে তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। এর আগে প্রথম দফায় অনুমতি না পেয়ে ফিরে আসার পর দ্বিতীয় দফায় প্রণালিতে প্রবেশের চেষ্টা করলে ইরানি নৌবাহিনীর সরাসরি সতর্কবার্তার মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় ‘বাংলার জয়যাত্রা’। ক্রমাগত সম্ভাব্য হামলার হুমকি ও ইরানি কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের কারণে জাহাজটিকে ঘুরিয়ে এনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মিনাসাকার বা দুবাই উপকূলের বহির্নোঙরে নিরাপদ অবস্থানে রাখা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধক্ষেত্রের সন্নিকটে সাগরে ভেসে থাকার এই অভিজ্ঞতাকে নাবিকেরা তাদের পেশাগত জীবনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ও ভীতিকর বলে বর্ণনা করেছেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাবিক জানান, সাগরে মাসের পর মাস ভেসে থাকার অভিজ্ঞতা তাদের নতুন নয়, তবে এমন যুদ্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা এর আগে কখনো হননি। পরিবার থেকে দূরে পরপর দুটি ঈদ কাটানো অত্যন্ত কষ্টকর এবং দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও তাদের নিরাপত্তা নিয়ে সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। 

জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান কিশোর জানিয়েছেন, গভীর সমুদ্রে ঈদের নামাজ আদায় শেষে তাদের সমবেত মোনাজাতে মূল আকুতিই ছিল নিরাপদে দেশে ফেরা। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হলেও তীরে নামার সুযোগ না থাকায় নাবিকদের মানসিক চাপ বেড়েই চলেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর এম মাহমুদুল মালেক জানান, সাগরে দীর্ঘদিন ভেসে থাকার বিষয়টি নাবিকদের কর্মজীবনেরই অংশ এবং জাহাজে থাকা সবার সুরক্ষার্থে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। 
বিএসসি কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, জাহাজে বর্তমানে পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও জ্বালানির ব্যবস্থা রয়েছে এবং ঈদ উপলক্ষে বিশেষ খাবারের আয়োজনও করা হয়েছিল। 

নাবিকেরা শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন উল্লেখ করে বিএসসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চ্যানেল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই অঞ্চল থেকে জাহাজ ও ৩১ নাবিককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়