রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ
ছবি: নিউজবাংলাদেশ
অসীম চাহিদা আর সীমিত সম্পদের কঠিন সমীকরণের মধ্যে দাঁড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নতুন বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে বিএনপি সরকার। ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতির দ্বিমুখী চাপের মধ্যেই প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল আকারের সম্প্রসারণশীল বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে অর্থ বিভাগ। দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের জন্য এই বাজেট একদিকে যেমন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের বড় মাধ্যম, অন্যদিকে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের এক কঠিন পরীক্ষা।
সূত্র জানায়, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ অনেক দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে। বিদ্যুৎ, কৃষি সেচ, পরিবহন ও শিল্প খাতে জ্বালানি নির্ভরতা থাকায় এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ কারণে সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও কৃচ্ছ্রসাধনের দিকে গেলেও উন্নয়ন বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট না করার অবস্থানে রয়েছে, কারণ এতে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র আরও জানায়, নতুন বাজেটে চারটি বিশেষ কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড এবং খাল কাটা কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সরাসরি জনগণের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যায়। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাস্তবতার কারণে ব্যয় কমানো সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে আগামী বাজেটেও ব্যয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রাক্কলনে বলা হচ্ছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। যদিও সাধারণত বাজেট প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়, তবে এবার তা কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। একই সঙ্গে আগামী বাজেটে ব্যয় ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও আলোচনায় এসেছে। প্রবাসী আয় ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে এবং রাজস্ব খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: ১৫ ব্যক্তি ও ৫ প্রতিষ্ঠানের হাতে স্বাধীনতা পদক তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী
চলতি অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও আগামী অর্থবছরে তা ৬.২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গড় মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, মার্চে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১ শতাংশ, যা এখনো উচ্চ চাপ নির্দেশ করে।
অর্থ বিভাগের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে, যা বাজেট ঘাটতি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এনবিআরকে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কৌশল নিতে হবে বলে জানানো হয়েছে। সম্প্রতি অর্থনীতির ঝুঁকি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং বাজেট কাঠামো নিয়ে সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল ও বাজেট মনিটরিং কমিটির বৈঠকে এসব বিষয় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে মূলত বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবকেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তার মতে, দীর্ঘ বিরতির পর বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ মিলিয়ে আসন্ন বাজেট হবে একটি ‘পরীক্ষামূলক বাজেট’।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, সুদ পরিশোধ ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় ঘাটতি বাজেটের বোঝা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে দুর্বল করতে পারে।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, তাই সুদের হার নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ঋণনির্ভরতা কমিয়ে আয় অনুযায়ী ব্যয় পরিকল্পনা গ্রহণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং উন্নয়ন ও সামাজিক ব্যয়ের চাপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ভারসাম্য রক্ষা করাই মূল লক্ষ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








