News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:২৫, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আবারও এলো অহংকার, দ্রোহ আর আত্মত্যাগের মাস ফেব্রুয়ারি

আবারও এলো অহংকার, দ্রোহ আর আত্মত্যাগের মাস ফেব্রুয়ারি

ফাইল ছবি

ইংরেজি ক্যালেন্ডারের পাতায় ফেব্রুয়ারির আগমন মানেই বাঙালির হৃদয়ে সেই চিরচেনা দ্রোহ, গৌরব এবং আত্মপরিচয়ের গভীর অনুরণন। ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী এই মাস বাঙালির শেকড় সন্ধানের মাস- যে মাসে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল এ জাতি। রাজপথ কাঁপানো স্লোগান আর লালে লাল মিছিলে অর্জিত বাংলা ভাষা এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অলংকার এবং জাতিসত্তার প্রতীক।

১৯৫২ সালের রক্তঝরা সেই দিনটি থেকে আজ ২০২৬, দীর্ঘ ৭৪ বছরের এই পথচলা আত্মত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই মাসটি বাঙালির জন্য কেবল ক্যালেন্ডারের একটি অংশ নয়, বরং শেকড় সন্ধানের এক পরম লগ্ন।

অমর একুশে কেবল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই; ইউনেস্কোর স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গের এমন নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’—এই কালজয়ী উচ্চারণে শুরু হয়েছে ভাষা আন্দোলনের মাস। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম সুসংগঠিত প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার উন্মেষের সূচনা।

ভাষা সংকটের সূত্রপাত দেশভাগের আগেই। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে হায়দারাবাদে অনুষ্ঠিত উর্দু সম্মেলনে মুসলিম লীগ নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হবে উর্দু। আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিনও এ দাবির সঙ্গে সুর মিলান। এর প্রতিবাদ জানান ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মনিঅর্ডার ফর্ম, পোস্টকার্ড, খাম এবং মুদ্রা থেকে বাংলা বাদ পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাভাষী জনগণ। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আন্দোলনের প্রাথমিক সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হয় তমদ্দুন মজলিস।

পাকিস্তান সরকারের ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বাংলার সমমর্যাদার দাবিতে আন্দোলন দ্রুত দানা বাঁধে। আন্দোলন দমনে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

আরও পড়ুন: নির্বাচন দেখতে আসছেন ৩৩০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের নিকট পুলিশ গুলি চালায়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শহীদ হন সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে। তাদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথ বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করে।

এই হত্যাকাণ্ডে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। শোক ও ক্ষোভে ফুঁসে ওঠা সেই দিনেই চট্টগ্রামে ভাষাসৈনিক ও কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রচনা করেন একুশের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। ভাষা শহীদদের প্রতিটি রক্তকণা তখন থেকে বাঙালির বুকে প্রতিবাদের আগুন হয়ে জ্বলছে।

রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষার মর্যাদা বাঙালিকে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নতুন প্রেরণা দেয়। সেই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় স্বাধিকার আন্দোলন, যা ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম দেয়। অবশেষে ১৯৫৪ সালের ৯ মে গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

ভাষার জন্য আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর, যখন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজ নিজ মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে দিনটি।

বাঙালি জাতির কাছে ফেব্রুয়ারি তাই শুধু শোকের নয়, শক্তিরও মাস—দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হওয়ার মাস, ভাষার প্রতি ভালোবাসার অঙ্গীকার পুনর্নবীকরণের সময়। সময়ের বিবর্তনে ভাষার বহমানতা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও একটি সত্য অটল- বাংলা ভাষাই বাঙালির প্রাণস্পন্দন।

ফেব্রুয়ারি এলেই নতুন দ্যুতিতে উদ্ভাসিত হয় বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম রিলে রেসের মতো বহন করে চলেছে বাংলা ভাষার উত্তরাধিকার। সাদা-কালোয়, শোক-গর্বে, উচ্চারণে ও গানে আবারও ধ্বনিত হবে- ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আমরি বাংলা ভাষা।’

চূড়ান্ত বিচারে ভাষা আন্দোলনের চেতনা স্মরণ করিয়ে দেয়- জয়ী হয় দেশ, মানুষ এবং প্রাণপ্রিয় মাতৃভাষা বাংলা। 

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়