News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:২৯, ৭ জানুয়ারি ২০২৬

সংস্কার রক্ষায় গণভোট: ইসিকে মাঠে নামার আহ্বান

সংস্কার রক্ষায় গণভোট: ইসিকে মাঠে নামার আহ্বান

ছবি: সংগৃহীত

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে পুনরায় ফ্যাসিবাদ ও একনায়কতন্ত্রের পুনরাবৃত্তি রোধে এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সরাসরি মাঠে নামার আহ্বান জানিয়েছেন নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। 

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের মতো ভঙ্গুর শাসনব্যবস্থা থেকে উত্তরণে ‘জুলাই সনদ’ ও প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর ওপর জনমত যাচাই বা গণভোট আয়োজন এখন সময়ের দাবি। এই প্রক্রিয়াকে প্রশ্নাতীত করতে শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে ইসিকে মবিলাইজেশন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপের এ টি এম শামসুল হক মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) আয়োজিত ‘গণভোট: ২০২৬—কী ও কেন?’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 

একই দিন সিরডাপ মিলনায়তনেই সুজন আয়োজিত আলোচনা সভা ও গোলটেবিল বৈঠকেও উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন গণভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা জোরালো করার আহ্বান জানান।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে এক গভীর রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। একটি প্রতাপশালী সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শিক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সবকিছু একটি ‘ইল্যুশনের’ ওপর দাঁড়িয়ে ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সে সময় ব্যতিক্রমী কোনো কথা বললেই গুম, খুন, জেল কিংবা সামাজিক সুযোগ–সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হতো।

উপদেষ্টা বলেন, এখন প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি আবার সেই অবস্থায় ফিরে যেতে চাই? গণতন্ত্রের কথা বলে একনায়কতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাব কি না, ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে কি না, ভোটের বাক্স দখল হবে কি না, মন্ত্রণালয় থেকে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত চলবে কি না—এই সব প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হবে গণভোটের মাধ্যমেই।

আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোদের নজরদারিতে রেখেছে সরকার: প্রেস সচিব

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আগের সরকারের জনগণের ভোটের প্রয়োজন ছিল না। অথচ গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকেও এখনো কোনো সুস্পষ্ট অঙ্গীকার শোনা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলো আগের মতোই চলতে চায়, নাকি পরিবর্তন চায়—সেটিও পরিষ্কার নয়। যেসব বড় দল ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তাদের মুখেও সংস্কার নিয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার শোনা যাচ্ছে না।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকার পরিচ্ছন্ন নির্বাচন দিতে চায় এবং অতীতের মতো শাসনব্যবস্থা আর দেখতে চায় না। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতায় প্রকৃত পরিবর্তন এসেছে কি না, সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। আগামী দিনে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে, তার বড় অংশ নির্ভর করবে ভোটারদের ওপর। নিজেরা না বদলালে সিস্টেম বদলাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গণভোটের প্রচার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু প্রচার হচ্ছে, সেটুকুই দৃশ্যমান। অথচ নির্বাচন কমিশনেরও দায়িত্ব রয়েছে জনগণকে জানানো—গণভোট কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কীভাবে এটি হবে। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, শুধু ভোট নয়, গণভোট নিয়েও জনগণকে বোঝাতে ইসিকে মবিলাইজ করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যদের সহযোগিতা নিতে হবে। এই কাজটি শুধু সরকার করলে নানা কথা উঠবে।

২০০৭ সালে সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সে সময় নাগরিক সংগঠনগুলো সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। এবারও সুজনসহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনকে জেলা পর্যায়ে গিয়ে প্রচার চালানোর আহ্বান জানান তিনি। ভবিষ্যতে যাতে অতীতের মতো শাসনব্যবস্থা ফিরে না আসে, সেজন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব সহযোগিতা করবে বলেও আশ্বাস দেন উপদেষ্টা।

বৈঠকে সুজনের প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, গণভোট কী এবং এর তাৎপর্য নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও সংশয় ও বিভ্রান্তি রয়েছে। এ অবস্থায় জনগণকে সচেতন করাই সবচেয়ে জরুরি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে সচেতনতা অপরিহার্য। দেশের মানুষ এখন আর শুধু আলোচনা নয়, সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে চায়।

ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তিন দফা আলোচনায় ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, যার ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়েছে। এই ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত, যেগুলোর জন্য সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হবে। বাকি প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব। এসব সংবিধান সংস্কারের ৪৮টি প্রস্তাবের ওপরই গণভোট হবে। ব্যালটে একটিই প্রশ্ন থাকবে—‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং এটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। তাই গণভোটে তারা হ্যাঁ না কি না—সে বিষয়ে দলগুলোর অবস্থান পরিষ্কার হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন করতে রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ঠেকাতে নানা ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হলে দেশে আবারও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে, যাকে ঠেকানো কারও পক্ষে সম্ভব হবে না। যদিও ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে, তবে তাদের বিপুল অবৈধ সম্পদ এবং দেশি–বিদেশি স্বার্থান্বেষী শক্তির কারণে সেই হুমকি এখনও বিদ্যমান।

আলোচনায় অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ বলেন, প্রান্তিক ভোটারদের বুথে পৌঁছানোর দায়িত্ব মূলত রাজনৈতিক দলগুলোরই। গ্রামীণ নিরক্ষর নারীদের কাছেও গণভোটের বার্তা পৌঁছাতে হবে—তাঁদের জানাতে হবে, এটি তাঁদের অস্তিত্ব ও ক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সুজনের সহসভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। গণভোটের পক্ষে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে প্রচার চালালে তা কার্যকর হতে পারে। সংস্কার না হলে জনগণ আবারও ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হবে—এই বার্তাটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।

বৈঠকে সুজনসহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এবং মতামত দেন।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়