News Bangladesh

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৩৮, ১ মার্চ ২০২৬

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলো ইরান, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলো ইরান, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে কৌশলগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পাল্টা জবাব হিসেবে তেহরান এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। 

শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাতে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। 

এর আগে শনিবার ভোরে ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা চালায় তেল আবিব ও ওয়াশিংটন, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হিসেবে বিবেচিত, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করে।

প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় থাকা জাহাজগুলো বারবার ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এর কাছ থেকে ভিএইচএফ বেতারতরঙ্গের মাধ্যমে বার্তা পাচ্ছে, যাতে বলা হয়েছে, "কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।" যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো নির্দেশের বিষয়টি স্বীকার করেনি।

গতকাল সকালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালায়। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। প্রতিশোধ হিসেবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। এই অবস্থার মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।

হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক চ্যানেল। এর এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ৪০ কিলোমিটার প্রশস্ত, তবে বড় জাহাজ চলাচলের জন্য যথেষ্ট গভীর। এই পথের মধ্য দিয়ে দৈনিক প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (EIA) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এছাড়া এই প্রণালির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ করা হয়।

আরও পড়ুন: ইরানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলা, নিহত বেড়ে ১৪৮

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ত্বরান্বিতভাবে বেড়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিমধ্যেই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস পূর্বাভাস দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি স্থগিত থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। ভারতের ইকুইরাস সিকিউরিটিজ বলেছে, সরবরাহ পথ বন্ধ হলে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৫–১১০ ডলারের মধ্যে উঠতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে প্রভাব পড়ছে কেবল ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেই নয়। চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া সহ এশিয়ার বড় বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলোও বিপর্যয়ের মুখোমুখি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় সাত লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালির মাধ্যমে আমদানি করে, যা তাদের মোট তেল আমদানি ও পেট্রোল ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাণিজ্যিক সংস্থা হাপাগ-লয়েড এবং অন্যান্য ট্রেডিং হাউজ ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জাহাজ পরিবহন স্থগিত করেছে। গ্রীস, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় জাহাজগুলোকে বিকল্প রুট ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যেই বিকল্প রপ্তানি রুট তৈরি করছে। সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে প্রতিদিন ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত অভ্যন্তরীণ পাইপলাইন ব্যবহার করে ফুজাইরাহ বন্দরের সঙ্গে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করছে। ইরানও গোরেহ-জাস্ক পাইপলাইন মাধ্যমে ৩.৫ লাখ ব্যারেল তেল প্রতিদিন পরিবহন করার সক্ষমতা রাখে, যদিও তা এখনো কার্যকর নয়। বিকল্প রুটগুলো মিলিতভাবে হরমুজ প্রণালির ১৫ শতাংশ তেল পরিবহন করতে সক্ষম।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের কাছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ ক্ষমতা, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী দ্রুতগামী নৌকা, সাবমেরিন, ন্যাভাল মাইন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম।

প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার জাহাজ হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে চলাচল করে, এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হবে দ্রুত আক্রমণকারী নৌযান এবং সাবমেরিনের মাধ্যমে মাইন স্থাপন করা। তবে বড় সামরিক জাহাজগুলো ইসরায়েলি বা মার্কিন বিমান হামলার সহজ লক্ষ্যবস্তু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেলের অন্যতম বৃহৎ গ্রাহক চীন। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য চীন প্রণালির স্থগিত থাকা বা তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি কোনোভাবে সহ্য করবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন হরমুজ প্রণালির বন্ধ হওয়া প্রতিরোধে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বিশাল প্রভাব পড়বে। ব্রেন্ট ক্রুড এবং ডাব্লিউটিআই সহ বিভিন্ন তেলের বাজারে দাম লাফিয়ে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলো এই পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তবে এশিয়ার দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহকারী দেশগুলোর জন্য ক্ষতির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়