পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্ক সামরিক জোটে যোগ দিতে পারে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত কয়েক মাসে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সামরিক বৈঠক এবং রিয়াদ-ইসলামাবাদ বিদ্যমান ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এই জল্পনাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসলামাবাদ’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে, তা এই ধরনের কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রেক্ষাপট হিসেবে ধরা হচ্ছে। নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার যদি আনুষ্ঠানিকভাবে এই জোটে যোগ দেয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন রূপ দিতে পারে।
এই সম্ভাব্য জোটের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের রিয়াদে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট (SDMA) চুক্তির মাধ্যমে। চুক্তির মূল ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এক দেশের ওপর হামলা হলে তা উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। অনেকে এটিকে ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা উদ্ভাবন হিসেবে দেখছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তুরস্কও এই জোটে যোগদানের বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনায় রয়েছে। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী, আর সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি সমন্বিত হলে এই তিন দেশের যৌথ সামরিক ও কৌশলগত ক্ষমতা একটি শক্তিশালী ত্রিভুজ গঠন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করলে মূলত প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, যৌথ সামরিক মহড়া এবং যুদ্ধসরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যে পাকিস্তানের সৌদি-মডেলের প্রতিরক্ষা চুক্তির আদলে একটি খসড়া চুক্তি তৈরি করতে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে। গত এক বছরে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের ঢাকা সফরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কূটনৈতিক চ্যানেল পুনরুদ্ধার এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানের পাকিস্তান সফরের সময় জেএফ-১৭ থান্ডার (JF-17 Thunder) যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই বিমান কেনা বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জন্য সুপার মুশাক (Super Mushshak) প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কেবল ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। তবে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক যোগদান মূলত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ওপর নির্ভর করবে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে খসড়া চুক্তির কাজ অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু এর চূড়ান্ত অনুমোদন পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের হাতে থাকবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের এই ধরনের সম্প্রসারিত জোটে যোগদান মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সমন্বয় এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ যদি এই চতুর্মুখী বা ত্রিপাক্ষিক জোটে যোগ দেয়, তা হবে মুসলিম বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর মধ্যে নজিরবিহীন নিরাপত্তা সমন্বয়।
সূত্র: টাইমস অব ইসলামাবাদ
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








