মার্কিন ভিসায় ‘ভিসা বন্ড’ বাধ্যতামূলক, তালিকায় বাংলাদেশ
ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরও বাড়ালো ট্রাম্প প্রশাসন। এখন থেকে বাংলাদেশসহ নির্দিষ্ট ৩৮টি দেশের নাগরিকদের মার্কিন বি১/বি২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘ভিসা বন্ড’ বা আর্থিক জামানত জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত নেওয়া হয়—সে দেশের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশকে এই তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (০৬ জানুয়ারি) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভ্রমণবিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য থেকে এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানা যায়।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, সর্বশেষ সংযোজনের ফলে বর্তমানে মোট ৩৮টি দেশ এই ভিসা বন্ড নীতির আওতায় রয়েছে। তালিকাভুক্ত দেশগুলোর বেশির ভাগই আফ্রিকার হলেও এতে লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, নতুন করে যুক্ত হওয়া দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই ভিসা বন্ড নীতি আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। তবে কিছু দেশের জন্য এর কার্যকারিতা শুরু হবে ভিন্ন তারিখে।
নতুন নীতিমালার আওতায় তালিকাভুক্ত দেশগুলোর ইস্যু করা পাসপোর্টধারী কোনো ব্যক্তি যদি বি১/বি২ (ভ্রমণ ও ব্যবসা) ভিসার জন্য যোগ্য বিবেচিত হন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আবেদন করতে তাকে ৫ হাজার, ১০ হাজার অথবা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বন্ড বা জামানত জমা দিতে হবে। ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় কনস্যুলার কর্মকর্তাই এই বন্ডের অঙ্ক নির্ধারণ করবেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার বন্ড ধার্য হলে, বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী (প্রতি ডলার ১২২.৩১ টাকা) আবেদনকারীকে প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জমা দিতে হতে পারে।
ভিসা বন্ড মূলত একটি আর্থিক নিশ্চয়তা ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য হলো—নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাধারীরা যেন যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত মেয়াদের বেশি সময় অবস্থান না করেন। কেউ যদি নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করেন, সেটিকে ভিসা ‘ওভারস্টে’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
আরও পড়ুন: ট্রাম্পকে কঠোর বার্তা দিলেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট শেনবাউম
পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, আবেদনকারীদের মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ‘আই-৩৫২’ ফরম পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম Pay.gov–এর মাধ্যমে বন্ডের শর্তাবলিতে সম্মতি জানানো বাধ্যতামূলক।
তবে বন্ড জমা দিলেই যে ভিসা নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে অথবা ভিসা পাওয়া ব্যক্তি যদি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালীন সব শর্ত যথাযথভাবে মেনে চলেন, তাহলে জমা দেওয়া বন্ডের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও বহির্গমনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হবে। এসব নির্ধারিত প্রবেশপথের মধ্যে রয়েছে বোস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (BOS), জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (JFK) এবং ওয়াশিংটন ডুলাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (IAD)। নির্ধারিত পথের বাইরে যাতায়াত করলে প্রবেশাধিকার প্রত্যাখ্যান বা দেশত্যাগের তথ্য সঠিকভাবে নথিবদ্ধ না হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
উল্লেখ্য, এই ভিসা বন্ড ব্যবস্থা পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি পাইলট কর্মসূচির আওতায় প্রথম চালু করা হয় গত বছরের আগস্টে। তখন প্রাথমিকভাবে কয়েকটি দেশকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে দেশ যুক্ত করে সর্বশেষ বাংলাদেশসহ আরও ২৫টি দেশের নাম সংযোজন করা হয়।
এর আগে অন্যান্য দেশও ওভারস্টে কমাতে ভিসা বন্ড ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। একসময় নিউজিল্যান্ড এমন একটি ব্যবস্থা চালু করলেও পরে তা বাতিল করে। একইভাবে যুক্তরাজ্য ২০১৩ সালে কিছু তথাকথিত ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা বন্ড চালুর পরিকল্পনা নিলেও শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
মার্কিন কর্মকর্তারা ভিসা বন্ড নীতিকে সমর্থন করে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকরা যাতে ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্রে অতিরিক্ত সময় অবস্থান না করেন, তা নিশ্চিত করতেই এই আর্থিক জামানত ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
ভিসা বন্ডের আওতায় থাকা দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে আলজেরিয়া (২১ জানুয়ারি ২০২৬), অ্যাঙ্গোলা (২১ জানুয়ারি ২০২৬), অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা (২১ জানুয়ারি ২০২৬), বাংলাদেশ (২১ জানুয়ারি ২০২৬), বেনিন (২১ জানুয়ারি ২০২৬), ভুটান (১ জানুয়ারি ২০২৬), বতসোয়ানা (১ জানুয়ারি ২০২৬), বুরুন্ডি (২১ জানুয়ারি ২০২৬), কাবো ভার্দে (২১ জানুয়ারি ২০২৬), মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (১ জানুয়ারি ২০২৬), কোট দিভোয়ার বা আইভরি কোস্ট (২১ জানুয়ারি ২০২৬), কিউবা (২১ জানুয়ারি ২০২৬), জিবুতি (২১ জানুয়ারি ২০২৬), ডোমিনিকা (২১ জানুয়ারি ২০২৬), ফিজি (২১ জানুয়ারি ২০২৬), গ্যাবন (২১ জানুয়ারি ২০২৬), গাম্বিয়া (১১ অক্টোবর ২০২৫), গিনি (১ জানুয়ারি ২০২৬), গিনি-বিসাউ (১ জানুয়ারি ২০২৬), কিরগিজস্তান (২১ জানুয়ারি ২০২৬), মালাউই (২০ আগস্ট ২০২৫), মৌরিতানিয়া (২৩ অক্টোবর ২০২৫), নামিবিয়া (১ জানুয়ারি ২০২৬), নেপাল (২১ জানুয়ারি ২০২৬), নাইজেরিয়া (২১ জানুয়ারি ২০২৬), সাও তমে ও প্রিন্সিপে (২৩ অক্টোবর ২০২৫), সেনেগাল (২১ জানুয়ারি ২০২৬), তাজিকিস্তান (২১ জানুয়ারি ২০২৬), তানজানিয়া (২৩ অক্টোবর ২০২৫), টোগো (২১ জানুয়ারি ২০২৬), টোঙ্গা (২১ জানুয়ারি ২০২৬), তুর্কমেনিস্তান (১ জানুয়ারি ২০২৬), টুভালু (২১ জানুয়ারি ২০২৬), উগান্ডা (২১ জানুয়ারি ২০২৬), ভানুয়াতু (২১ জানুয়ারি ২০২৬), ভেনেজুয়েলা (২১ জানুয়ারি ২০২৬), জাম্বিয়া (২০ আগস্ট ২০২৫) এবং জিম্বাবুয়ে (২১ জানুয়ারি ২০২৬)।
এই সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সংক্রান্ত বিদ্যমান কড়াকড়ি আরও জোরালো করার অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর অনেক নাগরিকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়া আগের তুলনায় আরও ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে উঠবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








