রুশ তেল নিয়ে ভারতের ওপর আরও শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের
ফাইল ছবি
রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির ইস্যুতে ভারতের ওপর নতুন করে আরও উচ্চহারে শুল্ক আরোপের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ওয়াশিংটনের দাবি অনুযায়ী তেল কেনা বন্ধ না করলে খুব দ্রুতই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় সময় রবিবার (০৪ জানুয়ারি) প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ানে’ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ও মোদি প্রসঙ্গ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূয়সী প্রশংসা করলেও বাণিজ্যিক স্বার্থে কোনো ছাড় দিতে রাজি নন বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ, কিন্তু তিনি জানতেন যে রাশিয়ার তেল আমদানির বিষয়ে আমি মোটেও খুশি নই। আমাকে খুশি রাখা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি এই ইস্যুতে আমাদের সহযোগিতা না করে, তবে আমরা খুব দ্রুতই ভারতীয় পণ্যের ওপর আরও শুল্ক বাড়িয়ে দেব।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ভারত মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট রাখতেই এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে তেল কেনা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে বলে তিনি আশা করছেন।
বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েন উল্লেখ্য যে, রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কেনার ‘শাস্তি’ হিসেবে গত বছরের আগস্ট মাসে ভারতীয় পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্যে ১০ শতাংশ সাধারণ শুল্কের পর ২৫ শতাংশ রেসিপ্রোকাল (পাল্টাপাল্টি) শুল্ক এবং পরবর্তীতে আরও ২৫ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক যোগ করা হয়। বর্তমানে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত এই শুল্ক বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
মার্কিন সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম জানিয়েছেন, ভারত এই শুল্ক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার অনুরোধ করেছে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বর্তমানে উল্টো আরও শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করছেন।
আরও পড়ুন: বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে ইরানে ‘হামলার’ হুমকি ট্রাম্পের
ভারতের অবস্থান ও জ্বালানি নিরাপত্তা শুল্কের বিশাল বোঝা সত্ত্বেও ভারতের অবস্থান এখনো অনড়।
শুরু থেকেই নয়াদিল্লি দাবি করে আসছে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে তেল সংগ্রহ করছে। তবে মার্কিন চাপ মোকাবিলায় ভারত সরকার সম্প্রতি কিছুটা নমনীয় কৌশল গ্রহণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, ভারত সরকার তাদের রিফাইনারিগুলোকে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনার তথ্য সাপ্তাহিক ভিত্তিতে প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এর ফলে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে আসতে পারে, যা ওয়াশিংটনকে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ঝুঁকির মুখে শ্রমবাজার বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, যদি নতুন করে শুল্ক বাড়ানো হয়, তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মার্কিন বাজারে ভারতীয় রপ্তানি ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। বর্তমানে ভারতের ওষুধ ও ইলেকট্রনিকস পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও বস্ত্র, পোশাক, রত্ন ও গয়না, কার্পেট এবং সামুদ্রিক খাবারের মতো শ্রমনিবিড় খাতগুলো ৫০ শতাংশ শুল্কের আওতায় রয়েছে। নতুন শুল্ক আরোপ করা হলে এই খাতগুলোতে নিয়োজিত লাখ লাখ শ্রমিক কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। ফলে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যগুলো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সক্ষমতা হারাবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য চুক্তি বিশ্ব রাজনীতিতে তেলের বাজারের অস্থিরতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের পর বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ এখন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।
ওপেকের তথ্যমতে, বিশ্বের মোট তেলের মজুদের ১৭ শতাংশই এখন ভেনেজুয়েলার হাতে, যা ভারতকে বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই দুই দেশ একটি বিস্তৃত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি (BTA) নিয়ে কাজ করছে, যার প্রথম ধাপ শিগগিরই ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই নতুন হুমকি সেই চুক্তি প্রক্রিয়াকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








