বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬: দখল-দূষণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে দেশের প্রাণপ্রবাহ
ফাইল ছবি
একসময় নদী ছিল শহরের প্রাণ। নৌকায় পণ্য আসত-যেত, নদীতীরে গড়ে উঠত বাজার, শিল্প ও জনবসতি। নদীর পানি কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মেটাত, আর নদীপথ ছিল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। রাজশাহীর শহরাঞ্চলেও এমনই এক নদীনির্ভর নগরজীবন ছিল। পদ্মা থেকে বেরিয়ে শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতো একাধিক শাখা নদী। নদীতীর ঘিরে গড়ে উঠেছিল রেশমশিল্পসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু নগর সম্প্রসারণ, নদী দখল, ভরাট, অবকাঠামো নির্মাণ ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সেই নদীগুলোর বড় অংশ আজ মানচিত্র থেকেই হারিয়ে গেছে।
বারাহী, স্বরমঙ্গলা ও দয়া রাজশাহী নগরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত এই তিন নদীর দৃশ্যমান অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। কোথাও নদীর খাত দখল করে স্থাপনা হয়েছে, কোথাও সড়ক, কোথাও নদীর পুরোনো প্রবাহপথ পরিণত হয়েছে ড্রেনে। আবার কোথাও নিচু জমি, জলাভূমি কিংবা সরু জলপ্রবাহ এখনো জানান দেয় এখান দিয়েই একসময় নদী বয়ে যেত। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে রাজশাহীর স্বরমঙ্গলা, বারাহী, নবগঙ্গা, বারনই ও হোজাসহ অন্তত পাঁচটি নদী এবং আশপাশের জলাভূমি শহর ও শিল্পবর্জ্যের দূষণে কালো পানির প্রবাহে পরিণত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।
আজ বিশ্ব নদী দিবস। সেপ্টেম্বরের শেষ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস পালিত হয়; ২০২৬ সালে দিবসটি পড়েছে ২৭ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশে নদী রক্ষার আলোচনায় এবারের প্রতিপাদ্য হিসেবে উঠে এসেছে বন নেই, নদী নেই, পানি নেই, জীবনও নেই। কিন্তু প্রতিপাদ্যের এই সতর্কবার্তার সঙ্গে দেশের নদীগুলোর বাস্তবতার দূরত্ব ক্রমেই কমে আসছে। একদিকে নদী হারিয়ে যাচ্ছে নগরায়ণের নিচে, অন্যদিকে টিকে থাকা নদীগুলো পরিণত হচ্ছে বর্জ্য ও দূষিত পানির আধারে।
রাজশাহী নগরের তালাইমারী এলাকায় ছিল স্বরমঙ্গলা নদীর উৎসমুখ। পদ্মা থেকে বেরিয়ে নদীটি কাজলা-জামালপুর ও নামোভদ্রা এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ললিতাহার, ভালুকপুকুর ও রামচন্দ্রপুর অতিক্রম করে ফলিয়ার বিলের দিকে যেত। নদীটির প্রবাহপথের কিছু অংশ এখনো নিচু জলাভূমি বা সরু জলধারা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর গবেষণায় এবং স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিবেদনে পুরোনো এই প্রবাহের বিবরণ পাওয়া যায়। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানেও স্বরমঙ্গলার পুরোনো প্রবাহের অংশ স্থানীয়ভাবে রাইচাঁদ নালা নামে টিকে থাকার তথ্য এসেছে।
স্বরমঙ্গলার সঙ্গে রাজশাহীর নগর-ইতিহাসের সম্পর্ক শুধু জলপ্রবাহে সীমাবদ্ধ ছিল না। নদীকে ঘিরে জনবসতি, নৌযাতায়াত ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠেছিল। পুরোনো বিবরণে নদীপথে নৌযান চলাচলের কথা পাওয়া যায়। রুয়েট এলাকার উত্তর-পূর্ব অংশের নাওডোবা নামটিও নদীর অতীতের একটি স্মৃতি বহন করে। সময়ের সঙ্গে নদীর প্রবাহ সংকুচিত হতে হতে একপর্যায়ে নদী হিসেবে তার পরিচয়ই হারিয়ে যায়। রাজশাহীর নদী নিয়ে প্রকাশিত গবেষণা ও পুরোনো নথিতে স্বরমঙ্গলা, দয়া ও বারাহীকে পদ্মার সঙ্গে যুক্ত পুরোনো জলপ্রবাহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দয়া ছিল স্বরমঙ্গলার একটি শাখা। বর্তমান রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় রুয়েট এলাকার কাছাকাছি স্বরমঙ্গলা থেকে দয়ার প্রবাহের সৃষ্টি হয়ে তা উত্তরমুখী হতো। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে প্রবাহিত হয়ে রেললাইনের দিকে যেত। স্থানীয় ভূপ্রকৃতিতে নদীর পুরোনো খাতের চিহ্ন দীর্ঘদিন টিকে ছিল। কোথাও সমতল ভূমির তুলনায় কয়েক ফুট নিচু, প্রশস্ত জলাভূমি হিসেবে দেখা যেত সেই প্রবাহপথ। বর্ষায় সেখানে পানি জমত, জলজ উদ্ভিদ জন্মাত এবং নদীর পুরোনো রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠত।
দয়ার প্রবাহ মেহেরচণ্ডী, খড়খড়ি, কুখুণ্ডী, বামনশিকড়, মল্লিকপুর, তেবাড়িয়া ও সারাংপুর অতিক্রম করে ঘোলহাড়িয়া এলাকার দিকে যেত। পরে স্বরমঙ্গলার সঙ্গে এর সংযোগ ঘটত। এই সম্মিলিত প্রবাহ বৃহত্তর জলব্যবস্থার অংশ হিসেবে ফলিয়ার বিলের দিকে চলে যেত।
নদী গবেষকদের মতে, নদীর অনেক অংশের সরকারি জমি এখনো পুনরুদ্ধারের সুযোগ রয়েছে; বর্ষার পানি ধারণ, কৃষিকাজ ও স্থানীয় জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনায় এসব পুরোনো প্রবাহপথকে পুনরুজ্জীবিত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বারাহীর গল্পটি আরও স্পষ্টভাবে দেখায়, কীভাবে একটি নদী নগর ড্রেনেজব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। পদ্মা থেকে উৎপন্ন বারাহী রাজশাহী নগরের ফুদকিপাড়া এলাকা দিয়ে শুরু হয়ে পবা উপজেলার মহানন্দখালীতে বারনই নদীতে গিয়ে মিশত। পুরোনো ব্রিটিশ প্রশাসনিক নথি, বিশেষ করে উইলিয়াম উইলসন হান্টারের Statistical Account of the District of Rajshahi, নদীটির অস্তিত্ব ও প্রবাহপথের ঐতিহাসিক প্রমাণ বহন করে। পুরোনো গবেষণা অনুযায়ী, নদীটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২০ কিলোমিটার; উৎসের প্রথম কয়েক কিলোমিটারেই এর দৃশ্যমান অস্তিত্ব এখন নেই।
নগরের কেন্দ্রভাগে বারাহীর পুরোনো প্রবাহপথ এখন অনেকাংশে বড় ড্রেনে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এক নম্বর ড্রেন দিয়ে শহরের পানি ও বর্জ্য প্রবাহিত হয়। সাহেব বাজার, জিরো পয়েন্ট, তুলাপট্টি, রানীবাজার, ষষ্ঠীতলা, নগর ভবন ও গ্রিন প্লাজাসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশের নিচ দিয়ে একসময় যে জলপ্রবাহ চলত, তার বড় অংশ আজ নগর অবকাঠামোর নিচে চাপা পড়ে আছে। কোথাও ভরাট হয়ে গেছে, কোথাও ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের অংশ হয়েছে, আবার কোথাও পুরোনো প্রবাহের ক্ষীণ চিহ্ন টিকে আছে।
পবা উপজেলার মুশরইল এলাকায় এখনো একটি কালভার্টের নিচ দিয়ে বারাহীর পুরোনো প্রবাহের অংশ দেখা যায়। তবে সেই পানির চরিত্র বদলে গেছে। একসময় যেখানে স্বচ্ছ পানি ও মাছ ছিল, এখন সেখানে শহরের বর্জ্যপানি প্রবাহিত হচ্ছে। রাজশাহীর নদী নিয়ে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্বরমঙ্গলা, বারাহী, নবগঙ্গা, বারনই ও হোজা নদীর পানি কালো ও বর্জ্যদূষিত হয়ে পড়ার কথা উঠে এসেছে। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত জলাভূমিগুলোর অবস্থাও একইভাবে সংকটাপন্ন।
রাজশাহীর এই বাস্তবতা যে কেবল অতীতের গল্প নয়, সাম্প্রতিক নাগরিক আন্দোলনও তার প্রমাণ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বারাহী, স্বরমঙ্গলা, নবগঙ্গা ও বারনই নদীর দখল-দূষণ বন্ধ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দাবিতে পবার নওহাটা এলাকায় মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মী, মৎস্যজীবী ও নদী-নির্ভর মানুষের অভিযোগ, নগরের বিভিন্ন ড্রেন ও নালা দিয়ে বিষাক্ত তরল বর্জ্য এসব নদীর মাধ্যমে বারনইয়ে গিয়ে পড়ছে।
রাজশাহীর ছোট নদীগুলোর পরিণতি মূলত দেশের বড় শহরগুলোর জন্যও একটি সতর্ক সংকেত। ঢাকায় নদীর সংকটের মাত্রা আরও বড়। রাজধানী ও আশপাশের নদী-খাল-জলাশয়ের ওপর কয়েক দশকের নগরায়ণ, শিল্পায়ন, দখল এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নদীগুলো শুধু নাব্যতা হারাচ্ছে না, শহরের বর্জ্য বহনের পথেও পরিণত হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় নদী নিয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় জানানো হয়েছে, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মিলিয়ন লিটার বর্জ্যপানি উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত অবস্থায় নদী ও জলপথে গিয়ে পড়ে। একই সময়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা নদীদূষণের কারণে বছরে বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা তুলে ধরেছেন।
ঢাকার নদীদূষণের অর্থনৈতিক ব্যয়ের একটি বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, নদী ও খাল দূষণের কারণে বছরে প্রায় ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। নদী পুনরুদ্ধার ও নগরকে নদীর সঙ্গে পুনঃসংযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করা প্রকৌশল ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের নথিতেও এই অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব উঠে এসেছে।
সমস্যাটি শুধু পয়োনিষ্কাশনেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংক-সম্পর্কিত ঢাকার পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা বিশ্লেষণে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন লিটার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য, প্রায় ২ হাজার ৪০০ মিলিয়ন লিটার শিল্পবর্জ্য এবং প্রায় ১০ হাজার টন কঠিন বর্জ্য বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যাসহ নদীব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বর্জ্যের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে, তলদেশে পলি ও দূষিত পদার্থ জমে এবং নগরের জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে।
রাজধানীর নদী হারানোর ইতিহাসও দীর্ঘ। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার সময় ঢাকা জেলায় নদীর সংখ্যা ছিল ১৫টি। এর মধ্যে আঁটি, কনাই, দোলাই, পান্ডো ও নড়াই এই পাঁচ নদী এখন আর অস্তিত্বশীল নয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার মূল ৪৩টি খালের মধ্যে ১৭টির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়ার এবং অবশিষ্ট অনেক খাল কেবল নাম বা নথিতে টিকে থাকার তথ্যও বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার মতো নদীগুলোও দীর্ঘদিনের দখল ও দূষণের কারণে তাদের স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়েছে। নদীতীরের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা, আবাসন ও বিভিন্ন স্থাপনা। কোথাও নদীর সীমানা সংকুচিত হয়েছে, কোথাও নালা ও ড্রেন নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অপরিশোধিত পানি সরাসরি প্রবেশ করছে। ফলে নদী রক্ষার প্রশ্নটি শুধু পানি বা পরিবেশের প্রশ্ন নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য, ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিল্পনীতি এবং অর্থনীতির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
আরও পড়ুন: আজ বিশ্ব গন্ডার দিবস
নদীদূষণের ভয়াবহতা শুধু চোখে দেখা কালো পানি বা দুর্গন্ধে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলো নদীর পানিতে রাসায়নিক ও জীবাণু দূষণের গভীরতা তুলে ধরছে।
সাভারের ট্যানারি শিল্পাঞ্চলের কাছাকাছি ধলেশ্বরী নদীর পানির গুণগত মান নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গবেষণায় পানিতে মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ এবং বৈদ্যুতিক পরিবাহিতার মাত্রা উচ্চ পাওয়া গেছে। গবেষণায় ভারী ধাতুর উপস্থিতিও শনাক্ত করা হয়েছে। পানিতে ই. কোলাই পাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ফিকাল কলিফর্মের উপস্থিতি নদীর পানিতে মানব ও প্রাণিজ বর্জ্যের দূষণের ইঙ্গিত দেয়। গবেষণার পানির গুণগত সূচক ও পরিবেশগত ঝুঁকির ফলাফল নদীর পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুতর সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা দেখিয়েছে।
বালু নদীর ক্ষেত্রেও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন মৌসুমে পাঁচটি স্থানে পানির নমুনা সংগ্রহ করে তাপমাত্রা, পিএইচ, বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা, টিডিএস, দ্রবীভূত অক্সিজেন, বিওডি ও বিভিন্ন ভারী ধাতু পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দ্রবীভূত অক্সিজেন ২ দশমিক ২৫ থেকে ৩ দশমিক ০৮ মিলিগ্রাম/লিটার এবং বিওডি ২১ দশমিক ৬৯ থেকে ২৪ দশমিক ৯২ মিলিগ্রাম/লিটার পর্যন্ত পাওয়া যায়; গবেষকেরা উচ্চ বিওডি ও কম ডিওকে জৈব দূষণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এর অর্থ হলো, নদীর পানি শুধু দৃশ্যত দূষিত নয়; পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি জলজ প্রাণীর টিকে থাকার পরিবেশকেও সংকুচিত করছে। নদীতে অতিরিক্ত জৈব বর্জ্য প্রবেশ করলে তা পচনের সময় পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন ব্যবহার করে। ফলে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেন কমে যায়। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য ও ভারী ধাতু দীর্ঘমেয়াদে নদীর তলানি, জলজ প্রাণী এবং খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নদী দখলের ব্যাপ্তিও এখন সরকারি পর্যায়ে পরিমাপযোগ্য। ২০২৬ সালের জুনে জাতীয় সংসদে নৌপরিবহনমন্ত্রী জানান, দেশে সরকারি তালিকায় নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১৫টি এবং সারা দেশে ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ নদীদখলদার শনাক্ত করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর দখলদারদের তালিকা হালনাগাদ করেছিল এবং জেলা প্রশাসকদের তা যাচাই করে উচ্ছেদ পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছিল।
একই সংসদীয় জবাবে জানানো হয়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ সংশোধনের উদ্যোগ চলছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা, পৃথক নদী আদালত, দখল-দূষণের অভিযোগ তদন্ত এবং দূষণের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও আদায়ের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ নদী রক্ষার জন্য আইন, প্রতিষ্ঠান ও নীতিগত কাঠামো ইতোমধ্যে রয়েছে; সংকটটি বড় অংশে বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের। একাধিক মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, বিআইডব্লিউটিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব নদী ও জলাশয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে কোনো একটি সংস্থার বিচ্ছিন্ন উচ্ছেদ বা খনন কার্যক্রম দিয়ে নদীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনা কঠিন।
ঢাকার পাঁচ প্রধান নদী বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, শীতলক্ষ্যা ও বালু ঘিরে সরকারের উদ্যোগও এগোচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে এসব নদীর তীরভূমিতে তীররক্ষা, ওয়াকওয়ে, জেটি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের তালিকায় প্রায় ২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্প রয়েছে। একই এডিপিতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানি ও আবর্জনা পরিষ্কারে সহায়ক জলযানসহ রিভার ক্লিনিং ভেসেল সংগ্রহের প্রকল্পও রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকার চারপাশের নদী ও জলপথকে সমন্বিতভাবে পুনরুদ্ধারের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা গঠনের কথাও জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে ৩৭ সদস্যের কেন্দ্রীয় সেলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী সমন্বয় করবে কার্যক্রম। শিল্পবর্জ্যের উৎস নিয়ন্ত্রণ, খাল ও ড্রেন থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং নদীর তলদেশে জমে থাকা বর্জ্য সরানো এ ধরনের কাজের জন্য তিনটি উপকমিটি কাজ করার কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশের বক্তব্যও এখন খণ্ডিত প্রকল্পের বদলে সমন্বিত পরিকল্পনার দিকে। কারণ নদী খনন করে একদিকে যদি বর্জ্য ফেলা অব্যাহত থাকে, অন্যদিকে যদি সংযোগকারী খাল দখল ও ভরাট হয়ে যায়, তাহলে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরবে না। একইভাবে নদীতীরের সৌন্দর্যায়ন বা ওয়াকওয়ে নির্মাণ নদীর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের বিকল্প নয়। প্রথমে নদীর প্রবাহ, দখল, বর্জ্যের উৎস, শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন ও সংযোগকারী খাল পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথাই সাম্প্রতিক নদী সংলাপে উঠে এসেছে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও বলেছেন, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীকে রক্ষা করতে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন; শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, দূষণের মূল উৎস বন্ধ করাও জরুরি।
রাজশাহীর বারাহী যদি শহরের ড্রেনে পরিণত হয়, স্বরমঙ্গলা যদি নালায় হারিয়ে যায়, দয়া যদি জলাভূমির স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ বা বালুর বর্তমান অবস্থাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একই ধারার নগরায়ণ ও ব্যবস্থাপনার ফল বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যাচ্ছে।
নদী হারালে শুধু একটি জলধারা হারায় না। হারায় জলাধারণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা, বর্ষার পানি নিষ্কাশনের পথ, মাছ ও জলজ প্রাণীর আবাস, কৃষির পানি, স্থানীয় জীবিকা এবং শহরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য। নদী ভরাট করে যে স্থাপনা বা সড়ক তৈরি হয়, তা হয়তো স্বল্পমেয়াদে নগর সম্প্রসারণের চাহিদা পূরণ করে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেই জায়গার জলপ্রবাহ বন্ধ হলে জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ে।
বাংলাদেশের নদীগুলো তাই কেবল নৌপথ বা পানি নিষ্কাশনের চ্যানেল নয়; এগুলো দেশের অর্থনীতি, কৃষি, খাদ্যব্যবস্থা, জীববৈচিত্র্য ও নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য অবকাঠামো। ২০২৬ সালের সরকারি হিসাবেই যখন ১ হাজার ৪১৫ নদী এবং প্রায় ২২ হাজার অবৈধ দখলদার শনাক্ত হওয়ার তথ্য সামনে আসে, তখন নদী রক্ষার চ্যালেঞ্জের ব্যাপ্তিও স্পষ্ট হয়।
রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোর ক্ষেত্রে এখনো পুরোনো সিএস ও আরএস রেকর্ড, ঐতিহাসিক নথি, ভূমির শ্রেণি, পুরোনো প্রবাহপথ এবং স্থানীয় স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে নদীর সীমানা শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রে প্রয়োজন একই সঙ্গে নদীর দখলমুক্তি, সংযোগকারী খাল পুনরুদ্ধার, শিল্পবর্জ্য ও পয়োবর্জ্যের উৎস নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত পানি-মান পর্যবেক্ষণ।
কারণ নদীকে শুধু খনন করে বাঁচানো যায় না; নদীকে বাঁচাতে হলে তার উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত পুরো প্রবাহব্যবস্থাকে বাঁচাতে হয়। শহরের ড্রেনকে নদী বানানো নয়, বরং নদীকে আবার নদী হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়াই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। আর সেই কাজ যত দেরি হবে, নদীর জায়গায় তৈরি হওয়া কংক্রিট ও বর্জ্যের স্তর তত গভীর হবে যা একসময় সরিয়ে নদী ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন করে তুলবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








