নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৯:৫৬, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরলেন তারেক রহমান

জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরলেন তারেক রহমান

ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগদান এবং বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেওয়া শেষে পাঁচ দিনের সফল নিউইয়র্ক সফর সম্পন্ন করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। 

রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালের দিকে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের নিয়মিত ফ্লাইটটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

এর আগে নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় ২৫ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় ফ্লাইটটি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি ও প্রয়োজনীয় ট্রানজিট শেষে ফ্লাইটটি ঢাকার পথ ধরে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং ৩৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই সফরে অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের এটিই প্রথম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। এর আগে গত জুন মাসে তিনি সরকারি সফরে মালয়েশিয়া ও চীন ভ্রমণ করেছিলেন। এছাড়া জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কোনো অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়লেন তিনি। এর আগে তার বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে এবং যার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন।

এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিমানমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, শামা ওবায়েদ এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ভাষণে তিনি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, চলমান মানবিক সংকট নিরসন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার এবং দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ওপর জোরালো গুরুত্ব আরোপ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সর্বাত্মক উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের অটল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। বর্তমান বিশ্বে চলমান সংঘাত নিরসনে যুদ্ধ বা অস্ত্রের পথ বাদ দিয়ে কূটনীতি, সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দেশের আপামর জনগণের ক্ষমতায়ন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের পক্ষ থেকে রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন বা থ্রি-আর কৌশল বাস্তবায়নের রূপরেখাও তুলে ধরা হয়।

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানান যে, নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশ দ্রুত সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো, কার্যকর ও দৃশ্যমান সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

আরও পড়ুন: বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি সই

সফরে জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের ভূ-রাজনৈতিক বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

নিউইয়র্ক সফরের সময় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তুরস্ক: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি আরও সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের পারস্পরিক সমন্বয় ও কূটনৈতিক মিত্রতা আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ভুটান ও মালদ্বীপ: ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান সুদীর্ঘ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচন নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্বব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান: বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়ন অগ্রাধিকার খাতসমূহ, বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। এ ছাড়া ম্যানহাটনে জেপিমরগানের সদরদপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে এই সফরে বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নতুন ১১টি উড়োজাহাজ কেনার বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশের বিমান পরিবহন খাতের আধুনিকায়ন এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পথকে আরও সুগম করবে।

পাকিস্তান ও ক্রোয়েশিয়া: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সামগ্রিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জাতিসংঘ নেতৃত্ব: জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘ সময় ধরে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিশ্বশান্তি রক্ষায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন এবং বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক কার্যক্রমে নেতৃত্বের ভূমিকার উচ্চ প্রশংসা করেন। এ ছাড়া হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-এমের এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সফরের বিভিন্ন পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনস্বাস্থ্য খাতের নানা উদ্যোগ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের হুমকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায় বৈঠকে তিনি মূল বক্তব্য প্রদান করেন। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অভিযোজন অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং আধুনিক জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জরুরি আহ্বান জানান।

স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ-সুইডেন-ইউএনএফপিএ যৌথভাবে আয়োজিত ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বপ্নের সুস্থ বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন। 

দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূল ভিত্তি হিসেবে রাখার ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান যে, বর্তমান সরকার অচিরেই আরও এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার নারী কর্মী এবং ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রী নিয়োগের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

পাশাপাশি, গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে আন্তর্জাতিক মানবিক চ্যালেঞ্জ ও টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়। গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক সুজম্যানের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুসেবা, টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী মূল্যে জীবনরক্ষাকারী টিকা সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়াও সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজ এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশ ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও সস্ত্রীক যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্ক সফরের বিভিন্ন কর্মসূচি ও কূটনৈতিক বৈঠক শেষে দেশবাসীর দোয়ায় সফলভাবে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন সরকারপ্রধান।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়