নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:৫১, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পোলট্রি খাদ্যের লাগামহীন দামে দিশাহারা প্রান্তিক খামারিরা

পোলট্রি খাদ্যের লাগামহীন দামে দিশাহারা প্রান্তিক খামারিরা

ফাইল ছবি

দেশের পোলট্রি ও প্রাণিজ খাদ্য খাতে এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকট তৈরি হয়েছে। ফিড বা পোলট্রি খাদ্যের প্রধান কাঁচামালগুলোর দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং এর বিপরীতে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের কাঙ্ক্ষিত বাজারদর না পাওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট ও প্রান্তিক খামারিরা মারাত্মক লোকসানের মুখে পড়েছেন। উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের এই চরম অসামঞ্জস্যতার কারণে অনেক খামারি ইতিমধ্যে তাদের খামারে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন কিংবা ব্যবসা চিরতরে গুটিয়ে নেওয়ার বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। 

দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্য এবং খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের আমিষের চাহিদা ও সামগ্রিক পোলট্রি শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, মানসম্মত ফিড তৈরির মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই ব্যয় হয় কেবল কাঁচামাল কেনায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এক মাসের ব্যবধানে ফিড তৈরির প্রায় সবকটি প্রধান উপাদানের দামই ব্যাপকহারে বেড়েছে। ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টার দাম কেজিপ্রতি ৩১ টাকা ৩০ পয়সা থেকে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায়। আন্তর্জাতিক বাজারেও ভুট্টার দাম প্রতি টন ২৩৫-২৪০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে পৌঁছেছে। স্থানীয় বাজারে মার্চ-এপ্রিল-মে মৌসুমে প্রতি কেজি ভুট্টা ২৮ থেকে ২৯ টাকায় পাওয়া গেলেও জুন, জুলাই ও আগস্টে তা বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় ঠেকেছে।

ভুট্টার পাশাপাশি অন্যান্য উপকরণের অবস্থাও ভয়াবহ। ডিওআরবির (ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যান) দাম প্রতি কেজি ২৬ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকা এবং ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়া ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সায় এবং সয়াবিন মিলের দাম ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকায় উন্নীত হয়েছে। মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে এই কাঁচামালগুলোর দাম নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। 

বগুড়ার পোলট্রি খামারি হাফিজুর রহমানের তথ্যমতে, ৫০ কেজির এক বস্তা ব্র্যান ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকায় এবং ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকায় পৌঁছেছে। এর সরাসরি প্রভাবে বর্তমানে মানভেদে ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিড ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

খাদ্যের পাশাপাশি ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের বর্ধিত খরচ খামারিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার নোলুয়া গ্রামের খামারি মাজেদুল হক জানান, তার খামারে ৩ হাজার মুরগি রয়েছে। এক মাস আগে যে খাদ্যের বস্তা ৩ হাজার ৪৭৫ টাকায় কেনা হতো, তা এখন ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৬৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সয়াবিন ফিড এবং পোলট্রি চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধের দামও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিল। যেখানে গত মাসে বিদ্যুৎ বিল ছিল প্রায় ৬ হাজার টাকা, সেখানে চলতি মাসে তা বেড়ে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। অথচ এর বিপরীতে বাজারে মুরগির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিছুদিন আগে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৪০ টাকায় বিক্রি হলেও সম্প্রতি তা কমে ১৩২ টাকায় নেমে এসেছে।

আরও পড়ুন: জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই উত্তপ্ত কাঁচাবাজার

দিনাজপুর সদর উপজেলার পাঁচবাড়ির খামারি মোমিনুল ইসলাম প্রতি মাসে ব্রয়লার মুরগির জন্য ৭০ বস্তা খাবার কিনতেন। কিন্তু ফিডের দাম দুই দফায় দফায় বাড়ায় তিনি এখন বাধ্য হয়ে ৬০ বস্তা খাবার দিচ্ছেন। এতে মুরগির কাঙ্ক্ষিত ওজন ও বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে এবং বাজারেও কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না। 

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার খাদ্য বিক্রেতা সলিম উল্যাহর মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশীয় ফিড উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে। অতিরিক্ত দামের কারণে সাধারণ ক্রেতারাও পোলট্রি পণ্য কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন।

উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের এই পাহাড়সম ব্যবধানের প্রতিবাদে গত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। রাজশাহী, গাজীপুর, পাবনা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী, ঢাকা, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক খামারিরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, মহাসড়ক অবরোধ, এমনকি ডিম ভেঙে ও রাস্তায় ফেলে অভিনব প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও চাঁদপুরের মতলব উত্তরে অনেক খামারি রাস্তায় নেমে ফিডের দাম কমানো, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং ডিম-মুরগির যৌক্তিক ও নির্দিষ্ট মূল্য নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। কোথাও কোথাও লোকসানের বোঝায় খামার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল উৎপাদন খরচ বাড়াই পোলট্রি খাতের একমাত্র সংকট নয়; খামারি পর্যায় থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত মূল্যের বিশাল ব্যবধানও এই খাতের একটি বড় গলদ। 

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. বাপন দে উল্লেখ করেছেন, অনেক সময় ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ টাকা হলেও প্রান্তিক খামারিরা পান মাত্র ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। বিপণন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের নানা স্তরের কারণে এই প্রায় ৪০ টাকার বড় ব্যবধান তৈরি হয়। এই অসংগঠিত বিপণন ব্যবস্থার কারণে উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ফায়দা লুটছে একটি চক্র। তিনি নিয়মিত বাজার তদারকি, দৃশ্যমান মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং মনিটরিং টিমের মাধ্যমে বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন।

ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (এফআইএবি) এবং বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ১৫০টি নিবন্ধিত ফিড কোম্পানি বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন বাণিজ্যিক খাদ্য উৎপাদন করে, যার ৭০ শতাংশই পোলট্রি ফিড। কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল থাকায় এবং স্থানীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধে এখনই সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এফআইএবি। 

সংগঠনটির মহাসচিব মো. আনোয়ারুল হক জানান, একক কোনো কোম্পানির পক্ষে এই বাড়তি আমদানিব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। তাই কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট, কর ও শুল্কের হার পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান ড. মো. শফিকুর রহমান শিশিরের মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্র্যানের অভ্যন্তরীণ চাহিদা আগে নিশ্চিত করা জরুরি। প্রয়োজনে এসব পণ্য রপ্তানিতে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদক ও স্থানীয় শিল্পের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রেখে আমদানিকৃত কাঁচামালের শুল্ক কমানো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে খামারিদের জন্য সাময়িক ভর্তুকি প্রদান এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের তরফ থেকে সময়োপযোগী ও লক্ষ্যভিত্তিক নীতিসহায়তা প্রদান করা না হলে দেশের পোলট্রি খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়