নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৩১, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক: নেপথ্যে যেসব কারণ

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক: নেপথ্যে যেসব কারণ

ফাইল ছবি

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ বাজার ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে নীতি সুদহারে (পলিসি রেট) আপাতত কোনো পরিবর্তন না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি)। 

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪তম মুদ্রানীতি কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন মুদ্রানীতি কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফেরদৌসী নাহার, মুদ্রানীতি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ইমাম আবু সাঈদ এবং কমিটির সদস্যসচিব ও মুদ্রানীতি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম সরকার।

নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখার নেপথ্য কারণ
গত ৩১ জুলাই দীর্ঘ ২১ মাস পর নীতি সুদহার কমানোর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সময় ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বা ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সেই হারই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। মূলত সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিম্নমুখী ধারায় থাকলেও তা চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতির এই হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থাকায় নীতি সুদহার কমানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মূল্যস্ফীতির নতুন ঝুঁকি: জ্বালানি তেল ও নতুন পে-স্কেল
মুদ্রানীতি কমিটির বৈঠকে দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে বলা হয়, বেশ কিছু নতুন ধাক্কা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত দেশের মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিতে পারে। এর মধ্যে প্রধান দুটি কারণ হলো স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন।

সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর ফলে নতুন দামে ডিজেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সরকারের আমদানি ব্যয় এবং ভর্তুকির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়া দেশের বাজারে প্রতিবেশী দেশের তুলনায় তেলের দাম কম থাকায় সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এই মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। চলতি বছরে এপ্রিল ও জুনে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের পর সেপ্টেম্বরের এই ২০ টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি এ বছরের তৃতীয় দফা বড় ধরনের মূল্য সমন্বয়।

আরও পড়ুন: ৯ মাসে খেলাপি ঋণ কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ

অন্যদিকে, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল কার্যকর করা হয়েছে। নতুন এই কাঠামো অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই নতুন বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর না হয়ে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তার ওপরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন ও পুরোনো মূল বেতনের পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ হারে পাবেন। পরবর্তীতে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই হার যথাক্রমে ৭০ ও ৭৫ শতাংশ হবে এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে পূর্ণাঙ্গ নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।

মূল্যস্ফীতির বর্তমান চিত্র
পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট বা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের আগস্টে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল, যা তার আগের মাস জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও তা চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এখনো বেশ উঁচুতে রয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের শেষ দিক থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক আগ্রাসীভাবে নীতি সুদহার বাড়াতে শুরু করেছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে ওঠার পরও কঠোর মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে নীতি সুদহার বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরের দিকে তা ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, যা দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় একই পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী এখন প্রতি তিন মাস পরপর মুদ্রানীতি পর্যালোচনা কমিটি দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দীর্ঘমেয়ায়ী প্রভাব, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি অস্থিতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন পে-স্কেলের প্রভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের অভিঘাত তৈরি হয়, তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) বা মূল্যস্ফীতির ওপর এসব অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ধাক্কার প্রকৃত প্রভাব কতখানি পড়ে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়