শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে বোমা হামলার মূল হোতা নাউফারের ২২০ বছরের
ছবি: সংগৃহীত
শ্রীলঙ্কার ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট ও রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী ট্র্যাজেডি হিসেবে পরিচিত ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে বোমা হামলার ঘটনায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন দেশটির উচ্চ আদালত।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা বহুল আলোচিত এই বিচারপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দোষী সাব্যস্ত করার পর বুধবার সাজা ঘোষণা করা হয়।
কলম্বোর স্থায়ী হাইকোর্ট ট্রায়াল-অ্যাট-বারের তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে ১৫ আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের প্রত্যেককে ২০০ থেকে ২৬০ বছর পর্যন্ত কঠোর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দণ্ডিতদের সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো, নেগোম্বো ও বাত্তিকালোয়ার তিনটি গির্জা এবং তিনটি বিলাসবহুল হোটেলে একযোগে এই সমন্বিত আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। প্রার্থনার সময় ঘটা ওই হামলায় ৪২ থেকে ৪৫ জন বিদেশি নাগরিকসহ অন্তত ২৭0 থেকে ২৭৯ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হন। মূলত স্থানীয় ইসলামপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠী ন্যাশনাল থাউহীদ জামাত (NTJ), যারা জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের (ISIS) আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল, এই নৃশংসতা ঘটিয়েছিল। সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া আত্মঘাতী বোমারুরা ঘটনাস্থলেই নিহত হওয়ায় তাদের বিচার করা সম্ভব হয়নি; তবে তাদের সহযোগিতাকারী, পরিকল্পনাকারী ও অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিচার চলেছে। শুনানি শেষে আদালত মোট ২৪ জন আসামির মধ্যে ১৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং অপর ৯ জনকে বেকসুর খালাস দেন। অভিযুক্তদের সবাই শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য। বিচার চলাকালে মূল অভিযুক্ত ২৫ জনের মধ্যে একজন পুলিশ হেফাজতে মারা যান।
আদালতের রায়ে সাজার মেয়াদ ভিন্ন ভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন আসামিকে ২০০ বছর করে, অন্য পাঁচজনকে ২২০ বছর করে, চারজনকে ২৪০ বছর করে এবং একজনকে ২৬০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা মূল পরিকল্পনাকারী বা রিংলিডার হিসেবে মোহাম্মদ নাউফার ওরফে নাউফার মৌলভীকে চিহ্নিত করেছিলেন। তাকেও এই রায়ে দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীনভাবে ২৩ হাজারেরও বেশি অভিযোগ আনা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রপক্ষে দুই হাজার তিনশর বেশি সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এ ছাড়া আলামত হিসেবে দুই হাজার ৭৬টি বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
আরও পড়ুন: শ্রীলংকায় গণকবরে ৫৭২ কঙ্কাল, মিললো চুড়ি, স্কুলব্যাগ, দুধের বোতল
আদালতের এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার রোমান ক্যাথলিক চার্চ। গির্জার পক্ষ থেকে যাজক জুড ফার্নান্দো সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। তবে ক্যাথলিক চার্চের পক্ষ থেকে বরাবরই দাবি করা হয়ে আসছে যে, কেবল মাঠপর্যায়ের সহায়তাকারীরাই নয়, এই বিশাল হামলার নেপথ্যে আরও গভীর কোনো রাজনৈতিক বা কুচক্রী মহলের হাত রয়েছে। হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া ও আহত ভুক্তভোগীরাও আদালতে উপস্থিত হয়ে বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি সন্তোষ ও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
ইস্টার সানডে হামলার ঘটনাটি শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থায় স্থায়ী দাগ কেটে গেছে। শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল যে, হামলার সুনির্দিষ্ট আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র তা রোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল। ভারতসহ বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও স্থানীয় প্রশাসন তা গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি। বিচারিক রায়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিচারও শুরু হয়েছে।
২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কার সুপ্রিম কোর্ট দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনাকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে বড় অংকের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া হামলার পথ তৈরি করে দেওয়ার অপরাধমূলক অবহেলার দায়ে শ্রীলঙ্কার সাবেক পুলিশপ্রধান ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হওয়ার নিয়ম রয়েছে।
এই হামলার নেপথ্য ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সুরেশ সাল্লের বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ৪-এর একটি প্রামাণ্যচিত্রে দাবি করা হয়েছিল যে, রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য রাজাপাকসে পরিবারের সুবিধা নিশ্চিত করতেই এই হামলা ঘটতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে এবং অভিযুক্ত সুরেশ সাল্লে উভয়েই এই অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছেন। তা সত্ত্বেও সাবেক প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং আইনি লড়াইয়ে তাকে নানা জটলার মুখে পড়তে হয়েছে।
২০০৯ সালে দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটার পর শ্রীলঙ্কার মাটিতে এটিই ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও নাড়া দেওয়া সন্ত্রাসী ঘটনা। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আসা এই বড় রায় দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হলেও, হামলার নিখুঁত নেপথ্য রহস্য ও রাজনৈতিক যোগসাজশ নিয়ে জনমনে থাকা প্রশ্নগুলো পুরোপুরি নিরসন হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








