আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:১০, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা, নিহত ৩

আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলা, নিহত ৩

ছবি: সংগৃহীত

আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী কুনার ও পাকতিকা প্রদেশে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে যে, সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত ও ভোরের দিকে চালানো এসব সামরিক আগ্রাসনে অন্তত তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রায় তিন মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে তীব্র সংকট ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

আফগান বার্তাসংস্থা খামা প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাত আড়াইটার দিকে কুনার প্রদেশের নূরগাল জেলার পাতান গ্রামের একটি আবাসিক বাড়িকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান প্রথম দফা বোমাবর্ষণ করে। এই আকস্মিক হামলায় একই পরিবারের তিন সাধারণ নাগরিক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হন। এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর, ভোর ৪টার দিকে পাকতিকা প্রদেশের বারমাল জেলার টোর কান্দি ও রাখা এলাকায় দ্বিতীয় দফায় বিমান হামলা চালানো হয়। 

তালেবান-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ও উপমুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত জানান, ওই এলাকার একটি দোকান ও একটি পরিত্যক্ত বাড়ি হামলায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হলেও সেখানে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

সীমান্তে নিরাপত্তা সংকট ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি নিয়ে কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দ্বন্দ্বের জের ধরেই এই নতুন হামলার ঘটনা ঘটল। তবে সোমবার সকাল পর্যন্ত এই বিমান হামলার বিষয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বা সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য বা স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন: শ্রীলঙ্কায় সর্ববৃহৎ গণকবর আবিষ্কার, ৫৮২ কঙ্কাল উদ্ধার

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রাণঘাতী হামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। এর ফলে দেশটির সামরিক বাহিনী এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান জোরদার করেছে। পাকিস্তানের মূল দাবি হলো, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) বা যাকে ইসলামাবাদ ফিতনা আল-খাওয়ারিজ হিসেবে অভিহিত করে থাকে, সেই জঙ্গিগোষ্ঠীটি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে নিরাপদ আস্তানা গড়ে তুলেছে এবং সেখান থেকেই পাকিস্তানে লাগাতার সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিমান হামলার মাত্র কয়েকদিন আগে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাংগু জেলায় জঙ্গিদের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষে দুই সামরিক কর্মকর্তাসহ ছয় সেনাসদস্য নিহত হন। এছাড়া কোহাটের পুলিশ স্থাপনা ও অন্যান্য সাম্প্রতিক হামলার পেছনেও আফগানিস্তান থেকে নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ।

তবে পাকিস্তানের এই সমস্ত অভিযোগ বরাবরই জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে আফগান তালেবান সরকার। কাবুলের স্পষ্ট অবস্থান হলো, আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে হামলার বিন্দুমাত্র সুযোগ কাউকে দেওয়া হচ্ছে না। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমটায় পুনরায় আসীন হওয়ার পর থেকেই সীমান্তজুড়ে পাকিস্তানের এই ধরনের বিমান হানা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগেও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী প্রদেশে বহুবার বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ইসলামাবাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার স্বার্থে এবং নিজেদের ভূখণ্ডে হামলা চালানো জঙ্গিদের অবকাঠামো ও নিরাপদ আস্তানাগুলো ধ্বংস করতেই আত্মরক্ষার অধিকার থেকে তারা এই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে।

অন্যদিকে, তালেবান প্রশাসন পাকিস্তানের এসব বিমান হামলাকে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট ও নগ্ন লঙ্ঘন বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। 

তাদের অভিযোগ, কথিত জঙ্গি আস্তানা টার্গেট করার নাম করে মূলত নিরীহ ও সাধারণ বেসামরিক নাগরিকদের ওপরই বোমা বর্ষণ করছে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে কাবুলের বিমান হামলায় চার শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার দাবি করেছিল আফগান তালেবান, যদিও পাকিস্তান তা অস্বীকার করে একে সন্ত্রাসবিরোধী সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযান বলে দাবি করেছিল। তাছাড়া গত জুলাই মাসে আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের দিকে ড্রোন হামলার অভিযোগও উঠেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ে উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অনমনীয় অবস্থান এবং সর্বশেষ বিমান হামলার ঘটনা কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যকার আগে থেকেই ভঙ্গুর ও টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ককে আরও বেশি অনিশ্চিত ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়