আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৫৯, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রীলঙ্কায় সর্ববৃহৎ গণকবর আবিষ্কার, ৫৮২ কঙ্কাল উদ্ধার

শ্রীলঙ্কায় সর্ববৃহৎ গণকবর আবিষ্কার, ৫৮২ কঙ্কাল উদ্ধার

ছবি: সংগৃহীত

শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলীয় শহর জাফনার কাছে চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের কাজ করার সময় দুর্ঘটনাবশত আবিষ্কৃত হয়েছে দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণকবর। ২৬ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সমাপ্তির পর শ্রীলঙ্কায় আবিষ্কৃত এটি অন্যতম বৃহত্তম গণকবর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তিনটি ধাপে চালানো প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে শিশু, নাবালক ও নবজাতকসহ মোট ৫৮২টি মানব কঙ্কাল ও দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। এই রোমহর্ষক ঘটনাটি পুরো তামিল সম্প্রদায়কে স্তম্ভিত করে দিয়েছে এবং নিখোঁজ প্রিয়জনদের খোঁজে থাকা স্বজনদের মনে নতুন করে তীব্র বেদনার জন্ম দিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে চেম্মানি এলাকায় শ্মশানের জমি খননের সময় হঠাৎ করেই স্থানীয় শ্রমিকেরা মানব কঙ্কালের সন্ধান পান। পরবর্তীতে বিচারিক নির্দেশে প্রত্নতাত্ত্বিক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা অনুসন্ধান ও খননকাজ শুরু করেন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের তৃতীয় দফার খনন শেষে আগস্টে কঙ্কালের সংখ্যা প্রায় ছয়শ ছুঁয়ে ফেলে। ঘটনাস্থল থেকে মানবদেহের অবশিষ্টাংশের পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রী। এসব জিনিসের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের দুধের বোতল, শিশুদের খেলনা, কাচের চুড়ি, ছোট স্কুল ব্যাগ, জুতা এবং শিশুদের পোশাক।

শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার গেহান গুণতিলকে জানিয়েছেন, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাথমিক পরিদর্শনে এটি স্পষ্ট যে এটি সাধারণ কোনো হিন্দু সামাজিক বা ধর্মীয় সমাধিস্থল নয়। এক থেকে দুই মিটার গভীরতার অগভীর গর্তে বস্ত্রহীন ও অসহায় অবস্থায় অসংখ্য মানুষের দেহ গাদাগাদি করে একের ওপর এক স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। 

ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশ কয়েকটি কঙ্কালে স্পষ্টভাবেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশেষ করে একটি কঙ্কালের দুই হাত বুকের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া সমস্ত আলামত বর্তমানে জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগে আদালতের হেফাজতে সংরক্ষিত রয়েছে।

চেম্মানি এলাকার ভয়াবহ ইতিহাস শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৯৯৫ সালে শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনী এলটিটিই-র হাত থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সম্পূর্ণ চেম্মানি অঞ্চলকে উচ্চ নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করে সেনা ক্যাম্প ও চেকপোস্ট বসায়, যা স্থানীয়দের কাছে উন্মুক্ত কারাগার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালে পোশাক পরিহিত ১৮ বছর বয়সী তামিল ছাত্রী কৃষান্থি কুমারস্বামীকে সেনা চৌকিতে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। তার খোঁজ করতে গিয়ে তার পরিবারের আরও তিন সদস্যও সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারান। পরে কলম্বোর একটি আদালত ওই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা সদস্যদের মৃত্যুদণ্ড দেয়।

বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সেনাসদস্য সোমারত্নে রাজাপক্ষে আদালতে জবানবন্দিতে বিস্ফোরক দাবি করেন যে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে চেম্মানি এলাকায় সেনাবাহিনীর হাতে নিহত অন্তত ৩০০ থেকে ৪০০ বেসামরিক নাগরিকের দেহ গণকবর দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯৯ সালে তার ওই জবানবন্দির ভিত্তিতে তৎকালীন সরকার চেম্মানিতে প্রথম খনন পরিচালনা করে ১০টির বেশি কঙ্কাল উদ্ধার করলেও, চলমান যুদ্ধের অজুহাতে সরকার সেই তদন্ত স্থগিত করে দেয় এবং কোনো ফলোআপ করা হয়নি। দীর্ঘকাল ধরে চেম্মানি একটি সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বহু অভিযোগ রয়েছে।

১৯৮৩ সালে শুরু হয়ে ২০০৯ সালের মে মাসে সমাপ্ত হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে আনুমানিক এক লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ২৩ হাজার বেসামরিক নাগরিকসহ হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন জাতিগত তামিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। শ্রীলঙ্কার সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী এবং লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই) উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তামিলরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের দাবিতে লড়াই করলেও, সাধারণ বেসামরিক মানুষেরা দুই পক্ষের সংঘাতের বলপ্রযুক্তিতে শিকার হন।

আরও পড়ুন: মারিবে হুথিদের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ, ৮০ জনের বেশি হুথি যোদ্ধা নিহত

১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে ১২ বছর বয়সী জেরুবি জয়াবালানের বাবা কান্দাইয়া জয়াবালান চেম্মানি এলাকার একটি সেনাচৌকিতে শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর নিখোঁজ হন। আজও বাবার কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি চেম্মানির গণকবরে ছুটে গেছেন কোনো উত্তর পাওয়ার আশায়। একইভাবে ২০০৭ সালে ২৪ বছর বয়সে নিখোঁজ হওয়া একমাত্র ছেলে জ্ঞানশীলন রবির ছবি হাতে প্রতিদিন কাঁদছেন সুশীলা নামের এক প্রবীণ মা। দশকের পর দশক ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো পরিবারগুলোর কাছে এই গণকবর একই সঙ্গে চরম বেদনার এবং সত্য জানার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ৫৮২ জনের এই দেহাবশেষ সরকারিভাবে নিখোঁজের তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের কি না, তা এখনও ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। 

প্রধান প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রাজ সোমদেব জানিয়েছেন, দেহাবশেষের বয়স ও মৃত্যুর কারণ জানতে আরও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে এবং একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন আদালতের কাছে জমা দেওয়া হবে। তবে এখনো পর্যন্ত দেহাবশেষগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা না হওয়ায় নিহতদের পরিচয় বা মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) এবং নিখোঁজদের পরিবারগুলো পক্ষপাতহীন ও স্বচ্ছতার জন্য একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের জোরালো দাবি জানাচ্ছে। 

তাদের মতে, শ্রীলঙ্কায় এর আগের গণকবরগুলোর তদন্তে ভুক্তভোগীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে কিংবা অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান রোরি মুঙ্গোভেনও এই তদন্তে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহায়তা যুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা সরকার জোর দিয়ে জানিয়েছে যে কেম্মানি এলাকার তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং দেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই তা পরিচালিত হওয়া উচিত। বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে শান্তি ও জাতিগত পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এই তদন্তে যুক্ত করার তীব্র বিরোধী। 

বিচারমন্ত্রী হার্শানা নানায়াক্কারা তামিল পরিবারগুলোকে সরকারি সংস্থাগুলো ব্যর্থ করেছে এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানান যে, সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়ে খননকাজ ও ডিএনএ পরীক্ষা চালিয়ে যাবে। তবে শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার ওয়ারুনা গামাগে বেসামরিক নাগরিককে হত্যা ও গণকবর দেওয়ার সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন যে যেকোনো অভিযোগের সত্যতা একমাত্র আদালতেই প্রমাণিত হতে হবে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়