বাসের পর লঞ্চভাড়া বাড়লো সর্বনিম্ন ৩৫ টাকা, অপরিবর্তিত ট্রেন
ফাইল ছবি
জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর দুই দিনের মাথায় বাসের পর এবার যাত্রীবাহী লঞ্চের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নৌপথে প্রথম ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
এতে প্রথম ১০০ কিলোমিটারের জন্য যাত্রীপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৩ টাকা ১৮ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে ২ টাকা ৫২ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭২ পয়সা হয়েছে। একই সঙ্গে নৌপথে যাত্রীর সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সচিবালয়ে নৌযান মালিকদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম নতুন ভাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিকভাবে লঞ্চভাড়া ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ সমন্বয় করা হয়েছে।
ভাড়া বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে সরকার ও নৌযান মালিকপক্ষ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে। এর আগে রোববার রাতে সরকার দেশের চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ায়। নতুন দামে ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। নতুন দর ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকার জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ে পড়ছে বলেও সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরপরই নৌযান মালিকরা লঞ্চভাড়া বাড়ানোর দাবি তোলেন। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, জ্বালানি ব্যয়, ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ নৌযান পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয় বিবেচনায় মালিকপক্ষ ১৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিল। তবে যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ও মালিকপক্ষের আলোচনায় ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এর আগে নৌযান মালিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন রুটে আরও বড় মাত্রায় ভাড়া বৃদ্ধির দাবির কথাও প্রকাশ্যে এসেছিল। ঢাকা-বরিশাল রুটে মালিকরা জ্বালানি ব্যয়, বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন চার্জ, শ্রমিকের মজুরি, নৌযানের সার্ভে ও রেজিস্ট্রেশন ফি, কর এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছিলেন। মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ৪ টাকা ৪৫ পয়সা এবং এর বেশি দূরত্বে ৪ টাকা ২ পয়সা পর্যন্ত ভাড়ার প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করা হয়।
নতুন ভাড়া কাঠামো অনুযায়ী, ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নৌপথে প্রতি কিলোমিটারে আগের ২ টাকা ৯৫ পয়সার সঙ্গে আরও ২৩ পয়সা যোগ হয়ে নতুন ভাড়া হয়েছে ৩ টাকা ১৮ পয়সা। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে আগের ২ টাকা ৫২ পয়সার সঙ্গে ২০ পয়সা যোগ হয়ে নতুন ভাড়া দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৭২ পয়সা। নৌপথে সর্বনিম্ন দূরত্ব ১০ কিলোমিটার ধরে ভাড়া নির্ধারণের প্রচলিত কাঠামোর কারণে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন। অর্থাৎ, ছোট দূরত্বের যাত্রীদের ক্ষেত্রে কিলোমিটারভিত্তিক হিসাবের পাশাপাশি ন্যূনতম ভাড়ার পরিবর্তনও সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নৌপথের ভাড়া সমন্বয় করা হয়েছিল। তখন প্রথম ১০০ কিলোমিটারে ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৮ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৯৫ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ১৪ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৫২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। একই সময়ে সর্বনিম্ন ভাড়া ২৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩২ টাকা করা হয়। ফলে কয়েক মাসের ব্যবধানে জ্বালানি ব্যয়ের দ্বিতীয় দফা চাপের কারণে নৌপথের ভাড়া আবারও সমন্বয় করা হলো।
আরও পড়ুন: বাসের ভাড়া বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি
লঞ্চভাড়া বৃদ্ধির আগে একই জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে সড়ক পরিবহনেও। মঙ্গলবার বাস ও মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং বুধবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত নির্দিষ্ট এলাকায় বাস-মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা করা হয়েছে। মহানগর এলাকায় বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। গ্যাসচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে এই নতুন ভাড়া প্রযোজ্য নয়।
বাসভাড়া সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও মালিকদের প্রস্তাব ছিল বেশি। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ার পর মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিল। তাদের হিসাব ছিল, জ্বালানির দাম প্রতি লিটারে ১ টাকা বাড়লে বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ পয়সা বাড়বে। সেই হিসাবে ২০ টাকা বৃদ্ধিতে ভাড়া ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। পরে যাত্রীদের স্বার্থ বিবেচনায় ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।
অন্যদিকে রেলের ভাড়া নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, রেলওয়ের ভাড়া বাড়ানোর চাপ রয়েছে, কারণ জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া অপরিবর্তিত রাখলে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান আরও বাড়তে পারে। তবে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে আপাতত বিদ্যমান ভাড়া বহাল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১০ বছর রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়নি এবং এর আগেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও রেলের ভাড়া অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে রেলের ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা থাকলেও ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন হলে তা যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
নৌপথের নতুন ভাড়া কার্যকরের সঙ্গে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকানো নিয়েও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে পরিবহন মালিকদের স্বেচ্ছাচারীভাবে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ দেওয়া হবে না। নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাসের ক্ষেত্রেও সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চার্ট অনুযায়ী ভাড়া আদায় হচ্ছে কি না, তা নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। এর আগে বাসভাড়া ঘোষণার সময়ও সরকার নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া নিলে আইনি ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে রুট পারমিট বাতিলের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।
সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়া নিয়ে আলাদা অবস্থান জানিয়েছেন মন্ত্রী। তার বক্তব্য, সিএনজির দাম বাড়েনি; ফলে সিএনজিচালিত যানবাহনের ভাড়া বাড়ানোর কোনো কারণ বা সুযোগ নেই। কেউ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে সিএনজিচালিত যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু যাত্রী পরিবহনের ভাড়াতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে পরিবহন, পণ্য পরিবহন, বন্দরসেবা ও শিল্প উৎপাদন ব্যয়েও এর প্রভাবের কথা উঠে এসেছে।
জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন ও শিল্প খাতের বিভিন্ন ব্যয়ও বাড়ছে এবং চট্টগ্রামের বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোর চার্জও বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন ভাড়ার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, সেচ ও উৎপাদন ব্যয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ফলে একদিকে জ্বালানি তেলের বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে পরিবহন খাতের ভাড়া সমন্বয়ের দাবি উঠছে, অন্যদিকে যাত্রী ও সাধারণ ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ সীমিত রাখার বিষয়টি সামনে থাকছে। সরকারের সঙ্গে পরিবহন মালিকদের আলোচনায় বাসের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ২০ পয়সার পরিবর্তে ১৭ পয়সা এবং লঞ্চের ক্ষেত্রে মালিকদের দাবির তুলনায় কম হারে ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত সেই সমন্বয়ের অংশ হিসেবে এসেছে। তবে নতুন ভাড়া কার্যকরের পর বাস্তবে নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে কি না, সেটি নজরদারি ও প্রয়োগের ওপরই ভাড়া সমন্বয়ের সুফল অনেকাংশে নির্ভর করবে।
এদিকে রেলের ভাড়া এখনো অপরিবর্তিত থাকায় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের তিন প্রধান গণপরিবহন ব্যবস্থায় ভাড়ার চিত্রও আপাতত এক নয় বাস ও লঞ্চে নতুন ভাড়া কার্যকর হয়েছে, আর রেলে পুরোনো ভাড়াই বহাল রয়েছে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








