আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৬:৪৯, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে ভারতের নতুন বার্তা

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে ভারতের নতুন বার্তা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চলমান টানাপোড়েন কাটিয়ে একটি ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী পথে এগিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে নয়াদিল্লি। 

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের নতুন দিল্লিতে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের জবাবে ভারতের এই অবস্থান উঠে আসে।

ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কাঠামোগত ব্যবস্থার মধ্য থেকেই সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে ভারত সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে বর্তমান পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি বা এগ্রিমো প্রদানের পর এই কূটনৈতিক বার্তা এল।

গত কয়েকমাস ধরে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে জল্পনা চলছিল যে, দিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিতে নয়াদিল্লি বিলম্ব করছে। তবে সব জল্পনা ও দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গত মঙ্গলবার ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে সবুজ সংকেত দেয় এবং ঢাকায় সম্মতিপত্র পাঠিয়ে দেয়। অভিজ্ঞ ও পেশাদার কূটনীতিক আসাদ আলম সিয়াম বর্তমান হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হয়ে খুব শীঘ্রই নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনে যোগ দেবেন। 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চপর্যায়ের এই কূটনৈতিক রদবদল ও দিল্লির দ্রুত সম্মতি দুই দেশের মধ্যকার বরফ গলে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকায় নতুন সরকার গঠিত হলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে খানিকটা শীতলতা নেমে আসে। তবে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নরেন্দ্র মোদীর সরকার দুপক্ষের সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবে ইতিপূর্বে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। যদিও ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং সেখানে তার রাজনৈতিক ও কন্টেন্টভিত্তিক বক্তব্য প্রদানকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর নিয়ে কিছু জটিলতা ও শর্তের গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। 

সাম্প্রতিক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর কিংবা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পূর্বে দেওয়া কোনো শর্ত প্রত্যাহারের বিষয়ে সরাসরি মুখ না খুললেও রণধীর জয়সোয়াল জানিয়েছেন যে, উপযুক্ত সময়ে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।

আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার আমলে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা, ঢাকাকে যে বার্তা দিল দিল্লি

বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরে তিনি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। 

তবে জাতিসংঘের এই কূটনীতির ফাঁকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় মুখপাত্র জানান যে, এ বিষয়ে এই মুহূর্তে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। একই সঙ্গে নিউইয়র্কে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের সূচি রয়েছে, যা দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও পারস্পরিক সম্পৃক্ততা বাড়ছে। ভারতের রাজস্থানের যোধপুর এয়ার ফোর্স স্টেশনে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৃহৎ বহুপক্ষীয় যুদ্ধবিমান মহড়া তরঙ্গ শক্তিতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী সরাসরি অংশ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের সমান্তরালে বাংলাদেশ একটি সি-১৩০জে পরিবহন বিমান নিয়ে এই মহড়ায় অংশ নেবে। ইতিপূর্বে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম তরঙ্গ শক্তি মহড়ায় বাংলাদেশ কেবল পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত থাকলেও, এবারের আসরে সরাসরি অংশগ্রহণ দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার আস্থার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রত্যর্পণ এবং জনগণের যাতায়াতের মতো বেশ কিছু সংবেদনশীল ও অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক বিবৃতি বা শুভেচ্ছা বিনিময়ের বাইরে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা এই স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে বাস্তবভিত্তিক ও ফলপ্রসূ সংলাপ শুরু হলেই কেবল দুই দেশের প্রকৃত অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লির পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎমুখী ও গঠনমূলক আলোচনার যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা মাঠপর্যায়ে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়