আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৫:৫১, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাতিসংঘে ট্রাম্পের ভাষণে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি

জাতিসংঘে ট্রাম্পের ভাষণে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর দাবি

ছবি: সংগৃহীত

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ৩৭ মিনিটের এই ভাষণে তিনি যুদ্ধবিরতি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক বিনিয়োগ, সামরিক অস্ত্রভান্ডার এবং অপরাধ দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নানা দাবি তুলে ধরেন। 

তবে সিএনএন, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং অন্যান্য প্রথমসারির সংবাদমাধ্যমের তথ্যানুসন্ধানে তার এসব দাবির বেশিরভাগই অতিরঞ্জিত, বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের সাফল্য জাহির করতে গিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত ও ভিত্তিহীন পরিসংখ্যান উপস্থাপন করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, তার বক্তব্যে উঠে আসা প্রধান দাবিগুলোর বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

যুদ্ধ অবসানের কৃতিত্ব ও বাস্তবতা
ভাষণে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে আটটি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছেন। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ড, কসোভো ও সার্বিয়া, রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ভারত ও পাকিস্তান, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান, গাজা সংঘাত, ইসরায়েল-ইরান সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ এবং মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যকার কূটনৈতিক বিরোধ।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই হিসাবটি সম্পূর্ণ অতিরঞ্জিত। প্রথমত, মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যকার বিরোধটি কোনো যুদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পকেন্দ্রিক কূটনৈতিক মতপার্থক্য। একইভাবে সার্বিয়া ও কসোভোর পরিস্থিতিও তার আমলে কোনো সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়নি। রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর ক্ষেত্রে শান্তিচুক্তি হলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। তাছাড়া, গাজায় মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়মিত হামলা অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, ট্রাম্প একদিকে ইসরায়েল-ইরান স্বল্পস্থায়ী সংঘাত থামানোর কৃতিত্ব নেন, অথচ তার নির্দেশেই মার্কিন বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বিতর্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি নিয়ে করা সতর্কতাকে উড়িয়ে দিতে গিয়ে ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছেন। 

তিনি দাবি করেন, অতীতে একদল লোক বলেছিল বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সবাই ১২ বছরের মধ্যে মারা যাবে, আর পৃথিবী উষ্ণ না হয়ে বরং ঠান্ডা হচ্ছিল বলেই পরবর্তীতে এর নাম বদলে জলবায়ু পরিবর্তন রাখা হয়েছে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ট্রাম্পের এই দাবি পুরোপুরি ভুল। বিগত ১১ বছরের রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে এগুলোই ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছরগুলোর অন্যতম। তাছাড়া, জলবায়ু বিজ্ঞানীদের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে কোথাও বলা হয়নি যে সবাই ১২ বছরের মধ্যে মারা যাবে; বরং তাতে বলা হয়েছিল যে বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে আগামী এক দশকের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কঠোরভাবে কমাতে হবে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, উষ্ণতা বৃদ্ধির বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাবে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন: হোয়াইট হাউসের ট্রাম্প টিভি চালু

বিনিয়োগের কাল্পনিক পরিসংখ্যান
বিশ্বজুড়ে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার যে দাবি ট্রাম্প করেছেন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ওয়েবসাইটে তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধান বিনিয়োগ ঘোষণার পরিমাণ ১১.২ ট্রিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে, যা তার দাবির অর্ধেকেরও কম। 

তাছাড়া, এই হিসেবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কোম্পানির প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অস্পষ্ট অঙ্কও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না।

সামরিক অস্ত্রভান্ডার ও গোলাবারুদ্ধ সংকট
যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রভান্ডার ফুরিয়ে আসছে বলে যে সমালোচনা রয়েছে, তা কঠোরভাবে নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় ঢের বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং রেকর্ড পরিমাণে অস্ত্র উৎপাদন চলছে।

পক্ষান্তরে, পেন্টাগনের তদারককারী ফেডারেল ইন্সপেক্টর জেনারেল এবং কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ও সুনির্দিষ্ট কিছু গোলাবারুদের মজুত আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। প্রতিরক্ষা শিল্পখাতে দক্ষ জনবল ও কাঁচামালের সংকটের কারণে এই অস্ত্রভান্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর সময় লাগবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।

অন্যান্য খাতের অতিরঞ্জিত দাবি
তেল সম্পদ: ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা একত্রে বিশ্বের ৬০ শতাংশেরও বেশি তেলের মালিক। অথচ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক রিজার্ভের হিসাব জুড়লেও এই পরিসংখ্যান বাস্তবসম্মত নয়।

মাদক জব্দ: সমুদ্রপথে মাদক পাচারের ৯৭ শতাংশ ধ্বংস করার যে দাবি তিনি করেছেন, তাকে অসম্ভব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন মাদক বিশেষজ্ঞরা। চোরাচালানের সম্পূর্ণ পরিমাণ অজানা থাকায় সুনির্দিষ্ট শতকরা হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি: মার্কিন অর্থনীতিতে নতুন চাকরি যুক্ত হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, ট্রাম্প তার ক্ষমতার মেয়াদে যে ১ মিলিয়নের বেশি বেসরকারি চাকরি সৃষ্টির দাবি করেছেন, প্রকৃত সরকারি উপাত্ত অনুযায়ী সেই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৭ হাজারের কাছাকাছি।

ওয়াশিংটনের অপরাধ হার: রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমে গেছে বলে যে দাবি করা হয়েছে, স্থানীয় পুলিশের প্রকাশিত তথ্য বলছে হ্রাসের প্রকৃত হার এর চেয়ে অনেক কম (প্রায় ১৫ থেকে ২৩ শতাংশের কাছাকাছি)। হোয়াইট হাউস বা প্রশাসন এই বিপুল হ্রাসের পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি।   

সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মতো বিশ্বমঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রাজনৈতিক সাফল্যের পরিধি বাড়াতে বহু ক্ষেত্রে পুরোনো পরিসংখ্যানের অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন উপস্থাপন করেছেন, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও স্বাধীন তথ্যযাচাইকারী সংস্থার অনুসন্ধানে ভুল প্রমাণিত হয়েছে।   

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়