রাশিয়ার নির্বাচনে পুতিনের রেকর্ড জয়
ছবি: সংগৃহীত
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থিত ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি এক ঐতিহাসিক ও নিরঙ্কুশ জয় অর্জন করেছে। কোনো প্রকার জোরালো রাজনৈতিক বিরোধিতা ছাড়াই অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিন দিন ধরে চলা এই নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস-এর প্রাথমিক ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নির্বাচনে প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার ৪৫০টি আসনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫৫টিতেই জয় নিশ্চিত করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। এই বিশাল বিজয়ের ফলে দলটি তাদের পূর্বের রেকর্ড ভেঙে কেবল সাংবিধানিক বা সুপারমাজোরিটিই ধরে রাখেনি, বরং প্রয়োজনবোধে সংবিধান সংশোধনের একক ক্ষমতাও অর্জন করেছে।
রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান এলা পামফিলোভা এবং অন্যান্য প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশেরও বেশি ভোট গণনার পর দেখা গেছে যে ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি প্রায় ৫৭.৮৩ থেকে ৫৭.৮৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ২০২১ সালের আগের স্টেট ডুমা নির্বাচনে দলটি যেখানে ৪৯.৮ শতাংশ বা ৩২৬টি আসন পেয়েছিল, সেখানে এবারের ফলাফলে তাদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৫৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচনে অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর মধ্যে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকা কমিউনিস্ট পার্টি অব রাশিয়ান ফেডারেশন ১৩.৮৪ থেকে ১৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ৪০টি আসনে জয়ী হয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপিআর) ৮.৭৩ থেকে ৮.৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৫টি আসন, নিউ পিপল পার্টি ৭.৯৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০টি আসন এবং আ জাস্ট রাশিয়া পার্টি ৪.৯৫ শতাংশ ভোট লাভ করেছে। রাশিয়ায় বৈধ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি হলেও এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৫৬ থেকে ৫৯ শতাংশের কাছাকাছি। মূল ব্যালটে ভোটগ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে বসবাসরত রুশ নাগরিকেরা ইলেকট্রনিক বা অনলাইন মাধ্যমেও ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে নতুন অস্ত্রে জবাব দেবে ইরান
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ এই নির্বাচনকে ইউক্রেনীয় সংকটের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন। ক্রেমলিনের মতে, এই ফলাফল স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে দেশের সাধারণ জনগণ ইউক্রেন যুদ্ধসহ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সার্বিক নীতি, রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ এবং নেতৃত্বের ওপর শতভাগ আস্থা ও সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন। উল্লেখ্য, ২০০১ সাল থেকে রাশিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির সর্বোচ্চ নীতিিনির্ধারক হিসেবে অনানুষ্ঠানিকভাবে পুতিনই সর্বেসর্বা ভূমিকা পালন করে আসছেন। যদিও ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি দলীয় প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন এবং বর্তমানে খাতায়কলমে তিনি নির্দলীয় রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত, তবুও এই দলের ধারাবাহিক সাফল্য মূলত পুতিনেরই রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, আঞ্চলিক নির্বাচনেও শাসক দলের জোরালো প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে চেচনিয়ায় আঞ্চলিক প্রধান রমজান কাদিরভ ৯৯.৮৫ শতাংশ অভূতপূর্ব ভোট পেয়ে পুনরায় বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাচন চলাকালীন শেষ দিনে রাজধানী মস্কোসহ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। রুশ কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। তাছাড়া রাশিয়া কর্তৃক দখলকৃত ও নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড যেমন দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন, জাপোরিঝঝিয়া এবং ক্রিমিয়া উপদ্বীপেও ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ইউক্রেন সরকার এই নির্বাচনকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
পাশাপাশি, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমা দেশগুলো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এই নির্বাচনকে কোনো প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রক্রিয়া না বলে বরং গণতন্ত্রের একটি লোকদেখানো প্রহসন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মানবাধিকার সংগঠন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের অভিযোগ, নির্বাচনে সরকারের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরোধী এবং প্রকৃত বিরোধী দলগুলোর বেশিরভাগ প্রার্থীকেই নানা অজুহাতে প্রার্থিতা থেকে আগেই দূরে রাখা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, সমস্ত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিতর্ককে ছাপিয়ে অর্জিত এই সুপারমাজোরিটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুতিনের নিয়ন্ত্রণকে আগামী দিনে আরও বেশি পোক্ত করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








