নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৭:৪২, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে স্পিকারের চিঠির অপেক্ষায় ইসি

গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে স্পিকারের চিঠির অপেক্ষায় ইসি

ছবি: সংগৃহীত

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্য পদ শূন্য ঘোষণার ব্যবস্থা নিতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিলেও জাতীয় সংসদ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা রেফারেন্স নির্বাচন কমিশনে আসেনি। ফলে দলীয় বহিষ্কারের ভিত্তিতে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। 

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন ভবনে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সংসদ থেকে চিঠি এলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইসি সচিব বলেন, জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে আগে চিঠি দিলেও সেটি দলীয় সিদ্ধান্তের তথ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইন অনুযায়ী সংসদ সচিবালয় বা স্পিকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো না হলে কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। 

তার ভাষায়, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে এখনো সংসদ থেকে কোনো চিঠি আসেনি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ বিষয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু আইন অনুযায়ী সংসদ থেকে কোনো চিঠি না এলে আমাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি জানান, সংসদ সচিবালয় থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বা রেফারেন্স পাওয়ার পর কমিশন আইন অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় যাবে।

গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে জটিলতার সূত্রপাত হয় গত জুলাইয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢাকার মগবাজারের একটি হোটেলে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। প্রথম দিকে জামায়াতের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও পরে গাজী নজরুল নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই তরুণীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক তদন্ত শুরু করে।

দলটির পক্ষ থেকে পরে জানানো হয়, সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলীয় সংবিধানের ৬২ অনুচ্ছেদের আওতায় নেওয়া ওই সিদ্ধান্তের কথা ২৩ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও জাতীয় সংসদের স্পিকারকে জানায় জামায়াত। চিঠিতে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করা হয়।

তবে জামায়াতের চিঠি পাওয়ার পরই সংসদ সদস্য পদ বাতিল করার সুযোগ নেই বলে সে সময় স্পষ্ট করেছিল নির্বাচন কমিশন। 

২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দল তার একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলেই সংবিধানের অধীনে ওই সদস্যের সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয় না। 

তিনি বলেছিলেন, বিষয়টি নিয়ে স্পিকার বা জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স এলে কমিশন সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে শুনানি ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

এখানেই গাজী নজরুলের এমপি পদ নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের ৪ দফায় বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচনের পর ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ দফায় বর্ণিত অযোগ্যতার অধীন হয়েছেন কি না, কিংবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার আসন শূন্য হবে কি না এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে এবং এ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

অন্যদিকে সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদে কোন কোন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে তা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শপথ না নেওয়া, অনুমতি ছাড়া টানা ৯০ বৈঠক-দিবস অনুপস্থিত থাকা, সংসদ ভেঙে যাওয়া, ৬৬ অনুচ্ছেদের অধীনে অযোগ্য হয়ে যাওয়া এবং ৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত পরিস্থিতির উদ্ভব। একই অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় সংসদ সদস্যের নিজের পদত্যাগের বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ওই দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। তবে দল কর্তৃক একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করার বিষয়টি ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষায় সরাসরি উল্লেখ নেই। 

আরও পড়ুন: আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় এমপি গাজী নজরুল ও তার স্ত্রী গ্রেফতার

এ কারণেই জুলাইয়ে নির্বাচন কমিশন বলেছিল, কেবল দলীয় বহিষ্কারের ভিত্তিতে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই; সংসদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স পেলে বিষয়টি আইন ও সংবিধানের আলোকে পর্যালোচনা করা হবে।

এই সাংবিধানিক অবস্থানের মধ্যেই আগস্ট ও সেপ্টেম্বরজুড়ে গাজী নজরুল সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল ছিলেন। এমনকি সেপ্টেম্বরের শুরুতে তাকে একটি সংসদীয় কমিটিতে রাখা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়। ৭ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গঠনের সময় তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে আপত্তির মুখে তাকে বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এর আগে জামায়াতও তাকে সংসদীয় কমিটিতে না রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল।

এর মধ্যে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। 

পুলিশ জানায়, ন্যাম ভবনের ভবন নম্বর ৫-এর তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটি গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনাস্থলে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর সদস্যরা যান এবং আলামত সংগ্রহ করেন। সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

ঘটনার পর গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু সে বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করেনি এবং তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে জানায়।

পরে মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। পুলিশ মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে।

সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত শুনানি শেষে গাজী নজরুল ইসলামের চার দিনের এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপপরিদর্শক শামসুজ্জোহা সরকার দুজনের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিলেন।

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় ফৌজদারি মামলা ও গ্রেফতারের ঘটনা গাজী নজরুলের রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংসদ সদস্য পদ নিয়ে পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে মামলা হওয়া বা গ্রেফতার হওয়ার অর্থ সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনো সদস্য অযোগ্য হয়েছেন কি না, কিংবা ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে তার আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন উঠলে নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।

এ মুহূর্তে তাই গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে দুটি পৃথক প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলছে। একদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আইনগত তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে; অন্যদিকে জুলাইয়ে জামায়াত থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ নিয়ে যে সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছিল, সেটি এখনো নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তির পর্যায়ে যায়নি। 

ইসি সচিব আখতার আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংসদ থেকে প্রয়োজনীয় চিঠি বা রেফারেন্স না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।

ফলে সাতক্ষীরা-৪ আসনটি আপাতত শূন্য ঘোষণা করা হয়নি এবং গাজী নজরুল ইসলাম সংসদ সদস্য হিসেবেই আছেন। পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে জাতীয় সংসদ বা স্পিকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স আসে কি না এবং এলে কমিশন সংবিধান ও প্রযোজ্য আইন পর্যালোচনার পর কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। একই সময়ে মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর মামলায় তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়