News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:৩৮, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
আপডেট: ১২:৩৯, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

ধারাবাহিক খুনে আতঙ্কের জনপদ মোহাম্মদপুর, এবারও মিলল ক্ষতবিক্ষত লাশ

ধারাবাহিক খুনে আতঙ্কের জনপদ মোহাম্মদপুর, এবারও মিলল ক্ষতবিক্ষত লাশ

ছবি: নিউজবাংলাদেশ (এআই জেনারেট)

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত সহিংসতায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্রমাগত অভিযান ও গণগ্রেপ্তারের মধ্যেও থামছে না সংঘাত ও হত্যাকাণ্ড। কিশোর গ্যাং লিডার এ্যালেক্স ইমন হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই মাত্র চার দিনের মাথায় একই কায়দায় আসাদুল হক (২৮) ওরফে ‘লম্বু আসাদুল’ নামে আরেক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কিশোর গ্যাংগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে মোহাম্মদপুর থানাধীন বেড়িবাঁধ এলাকার সাদেক খানের ইটখোলা সংলগ্ন রাস্তায় নিহতের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তিনি বরিশালের গৌরনদী থানার কালনা এলাকার জলিল সর্দারের ছেলে এবং মোহাম্মদপুরের মেট্রো হাউজিংয়ের বি-ব্লকের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিনরাস্তা মোড় থেকে হাজারীবাগ যাওয়ার পথে পথচারীরা তার মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। তার বুক ও পিঠে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পূর্ব শত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তবে ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তদন্ত ও অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

এর মাত্র চার দিন আগে একই এলাকায় কিশোর গ্যাং নেতা ইমন হোসেন ওরফে ‘অ্যালেক্স ইমন’ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ গ্রুপের হামলায় তিনি নিহত হন। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা ছিল এবং এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে।

আরও পড়ুন: পীর শামীম হত্যা: জেলা শিবিরের সাবেক সভাপতিসহ ৪ জনের নামে মামলা

ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা জানান, ইমন হত্যার ঘটনায় তার মা ফেরদৌসী বাদী হয়ে মামলা করেছেন, যেখানে ২১ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ১০-১২ জন অজ্ঞাতকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, আরমান শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, গত দুই বছরে মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর তৎপরতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অর্ধশতাধিক গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের মধ্যে ‘কবজি কাটা গ্রুপ’, ‘পাটালি গ্রুপ’, ‘বেলচা মনির’, ‘টুন্ডা বাবু’, ‘লও ঠেলা’, ‘কালা রাসেল’, ‘ল্যাংড়া হাসান’ ও ‘চেতাইলেই ভেজাল’ উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রুপ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং সশস্ত্র হামলার ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত এক বছরে এসব গ্যাংয়ের সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত এবং ১৫ জনের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাসায় ঢুকে হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, এবং ছিনতাইয়ের সময় অঙ্গহানির মতো ঘটনা। ২০২৪ সালের বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, গত এক বছরে মোহাম্মদপুর এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে অন্তত তিন হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে গ্রেফতারের পরও জামিনে বের হয়ে অনেকেই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে অপরাধীচক্র আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে মোহাম্মদপুর-আদাবর এলাকা রাজধানীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

সূত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট সংঘর্ষে একাধিক প্রাণহানি, পুলিশ ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা, এবং প্রকাশ্য সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ঘটনা ঘটেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি দুই পুলিশ সদস্য এবং ১ সেপ্টেম্বর আরও এক পুলিশ সদস্য কুপিয়ে আহত হন। একই বছর আদাবর বালুরমাঠ এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় এক যুবকের কবজি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাও ঘটে।

এছাড়া ৮ মার্চ দুর্নীতি দমন কমিশনের এক মহাপরিচালক মোহাম্মদপুরে ছিনতাইয়ের শিকার হন এবং হামলার মুখে পড়েন। ২১ ফেব্রুয়ারি মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকায় একটি কারখানায় হামলার ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়।

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা মনে করছেন, সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাংগুলোর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে মোহাম্মদপুরে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়