News Bangladesh

স্টাফ রিপোর্টার || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৮:৩৬, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬

ইউসিবি পরিচালক পর্ষদ পুনর্গঠন অসম্পূর্ণ রেখে বিদায় নিচ্ছেন গভর্নর

ইউসিবি পরিচালক পর্ষদ পুনর্গঠন অসম্পূর্ণ রেখে বিদায় নিচ্ছেন গভর্নর

ছবি: সংগৃহীত

কার্যত দিকহীন ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে পড়ে আছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন অসম্পূর্ণ রেখেই বিদায় নিচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, যাতে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

একসময় দেশের প্রথম সারির একটি বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ইউসিবি নিয়মিতভাবে শেয়ারহোল্ডারদের প্রায় ২০ শতাংশ হারে ডিভিডেন্ড প্রদান করত। কিন্তু স্বৈরাচার সরকারের আমলে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ব্যাংকটি দখলে চলে যায় বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী আক্তারুজ্জামান ও এস আলম পরিবারের হাতে। দখলদারিত্বের পর থেকেই ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে।

এর ফলে ব্যাংকের গ্রোথ থেমে যায়, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে এবং ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে ডিভিডেন্ড। ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধসের পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত লুটপাট, ব্যাপক মানি লন্ডারিং এবং দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার চরম অভাব।

স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৎকালীন পরিচালকদের মধ্য থেকে মাত্র দু’জনকে শর্তসাপেক্ষে রেখে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। শর্ত ছিল-পর্যায়ক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বোর্ড গঠন করা হবে। তবে বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

বরং সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, ইচ্ছাকৃত গড়িমসি ও সমঝোতার মাধ্যমে ব্যাংকটিকে অকার্যকর অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছে। 

আরও পড়ুন: চাপিয়ে দেওয়া নয়-ছয়ের সুদে আর ফিরবে না অর্থনীতি: গভর্নর

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শর্তসাপেক্ষে থাকা দু’জন পরিচালকের একজন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে বিতর্কিত এবং অন্যজন দেশের বাইরে দুবাইয়ে অবস্থানরত। তিন জন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকলেও পাঁচ সদস্যের বোর্ডে একজন অনুপস্থিত থাকলেই বোর্ড সভা ও নির্বাহী কমিটির বৈঠক বসানো যায় না। ফলে ব্যাংকের নীতিনির্ধারণ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। 

সাম্প্রতিক কালে রাইট শেয়ার ঘোষণা করেছে ইউসিবি। যে ব্যাংকের শেয়ার ভ্যালু ফেস ভ্যালু থেকে কম সেই ব্যাংক অদূর ভবিষ্যতে কোন দিন শেয়ার ডিভিডেন্ড দিতে পারবে কি না তা অনিশ্চিত। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে আবারো ব্যাংকটি পরিবারতন্ত্র করার জন্য। ব্যাপারটা এমন ছিল আবারো শেয়ার ক্ষমতা দিয়ে ব্যাংকের একক ক্ষমতা অর্জন করা। রাইট শেয়ারে তখনই বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করে যখন ব্যাংকটি মার্জার এবং অ্যাকুইজিশনের মাধ্যমে ব্যাংকটি আরো বড় এবং লাভবান হবে।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে একটি বিশেষ মহল ব্যাংকের ভেতরে ভেতরে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত রয়েছে, যা আর্থিক খাতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

উল্লেখ্য, গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে পারটেক্স পরিবারের অন্যতম শেয়ারহোল্ডার শওকত আজিজ রাসেল পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের প্রাথমিক শর্ত বাস্তবায়নের দাবিতে পুনরায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, বিগত আঠারো মাসে কী এমন অদৃশ্য শক্তি কাজ করেছে, যার কারণে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন সম্ভব হলো না? নাকি ব্যাংকিং খাতে দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভেতরেও রয়েছে অদৃশ্য চাপ ও প্রভাব?

ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করলে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “আমি মনে করি এখানে দুর্নীতি ও লুটপাটের প্রভাব স্পষ্ট। আমি মনে করি, এখানে দুবাই ও লন্ডনের কিছুটা হলেও প্রভাব কাজ করছে।”

তিনি বলেন, “এই অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জাতীয় নির্বাচনের পর পারটেক্স পরিবার ইউসিবির শেয়ার ধরে রাখবে নাকি বিক্রি করবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন না হলে ইউসিবির মতো একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক আরও গভীর সংকটে পড়বে, যার দায় এড়াতে পারবে না সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/এনডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়