News Bangladesh

নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:১৮, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

ঘোষণা ছাড়াই সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর দ্বিগুণ

ঘোষণা ছাড়াই সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর দ্বিগুণ

ফাইল ছবি

কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা আগাম ঘোষণা ছাড়াই জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর। 

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তুলতে গিয়ে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, তাদের হাতে আসা অর্থের পরিমাণ আগের তুলনায় কমে গেছে। মূলত ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ কার্যকর করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, আমরা যারা ছোট বিনিয়োগকারী, তাদের ওপর নীরবে কর বাড়ানো হলো। কোথাও কোনো ঘোষণা নেই, কোনো প্রজ্ঞাপন নেই। এভাবে চুপিসারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার বাসিন্দা কমরুল ইসলাম। তিনি তার স্ত্রীর নামে পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন জনতা ব্যাংকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে। জানুয়ারিতে মুনাফা কমে যাওয়ার কারণ জানতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, উৎসে কর দ্বিগুণ কাটা হয়েছে। 

তার ভাষায়, কোনো ধরনের প্রজ্ঞাপন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া এভাবে কর বাড়ানো আইনগত ও নৈতিক- উভয় দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। আগের হারে উৎসে কর কার্যকর করে কেটে নেওয়া অতিরিক্ত অর্থ ফেরতের দাবি জানান তিনি।

জিগাতলা পোস্ট অফিস এলাকার আয়েশা জানান, দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুনাফা পেয়েছিলেন ১ হাজার ৮২৪ টাকা। কিন্তু একই বিনিয়োগ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মুনাফা নেমে আসে ১ হাজার ৭২৮ টাকায়। এই অর্থ দিয়েই তিনি সংসারের ছোটখাটো খরচ চালান বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন: চাপিয়ে দেওয়া নয়-ছয়ের সুদে আর ফিরবে না অর্থনীতি: গভর্নর

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন ও জনসংযোগ) মো. রেজানুর রহমান বলেন, আগে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর ছিল ৫ শতাংশ এবং পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে ১০ শতাংশ। তবে সর্বশেষ আয়কর আইন–২০২৩ অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সব ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর আরোপের বিধান রয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেই ছাড় প্রত্যাহার করায় এখন সব বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কার্যকর হয়েছে। ফলে পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারীরা জানুয়ারি মাসে তুলনামূলক কম মুনাফা পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে, তবে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি দেখবেন বলেও জানান তিনি।

সঞ্চয়পত্র দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম। বিশেষ করে ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক কম উৎসে কর এই খাতে বিনিয়োগের একটি বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করত। নতুন ব্যবস্থায় সেই সুবিধা কার্যত তুলে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ১ জানুয়ারি থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হার কমানোর ঘোষণা দেয়। তবে চার দিনের মধ্যেই সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। ফলে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যে মুনাফার হার কার্যকর ছিল, তা ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেও বহাল রয়েছে।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য দুটি ধাপ চালু রয়েছে। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচে বিনিয়োগকারীরা প্রথম ধাপে এবং এর বেশি বিনিয়োগকারীরা দ্বিতীয় ধাপে অন্তর্ভুক্ত। স্কিমভেদে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার হার সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কাগজে-কলমে মুনাফার হার অপরিবর্তিত থাকলেও বাড়তি উৎসে করের কারণে বিনিয়োগকারীদের হাতে পৌঁছানো প্রকৃত আয় কমে গেছে। বিশেষ করে যারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে নিয়মিত ব্যয় মেটান, তাদের জন্য এই পরিবর্তন আর্থিক চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে ঘোষণা ও প্রজ্ঞাপন ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থার জায়গায় প্রশ্ন তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়