৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা, নিঃস্ব হওয়ার শঙ্কায় বিনিয়োগকারী
ফাইল ছবি
দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চরম সংকটে থাকা ৯টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়নের (লিকুইডেশন) প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিষ্ঠানগুলোর নজিরবিহীন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং খেলাপি ঋণের পাহাড় জমার প্রেক্ষাপটে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার আমানতকারী এবং পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কার্যত খেলাপি ঋণের হার ৯০ শতাংশের বেশি হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া অবস্থায় পৌঁছেছে।
এনবিএফআইগুলো অবসায়নের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এফএএস ফিন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসেস।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এ সপ্তাহেই সংশ্লিষ্ট ৯টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক ও শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, সম্পদের পরিমাণ ও আমানত ফেরতের বাস্তব সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হবে। এরপর চূড়ান্ত করণীয় ঠিক করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবলুপ্ত হলেও কারো আমানত খোয়া যাবে না। সবাই টাকা ফেরত পাবেন।
তিনি বলেন, সঞ্চয়ী আমানতকারীদের পাশাপাশি স্থায়ী আমানতকারীদেরও টাকা ফেরত দেওয়া হবে। তবে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এরপর মধ্যম ও বড় আমানতকারীরা তাদের অর্থ পাবেন।
তিনি আরও বলেন, আমানতের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনেক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠান সমস্যায় রয়েছে এবং গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। তাদের ঋণের বিপরীতে জামানতও খুবই কম, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগুলোর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবা কম মনে করছে।
উল্লেখযোগ্য যে, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের সাথে যুক্ত। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের সাইফুল আলম বা এস আলমেরও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সরকার এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ অন্তত তাদের জমাকৃত অর্থের একটি অংশ দ্রুত ফেরত পায়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বড় অঙ্কের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আরও পড়ুন: একসঙ্গে সব দুর্বল ব্যাংক ঠিক করা সম্ভব নয়: গভর্নর
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুমাত্র মূল টাকা ফেরত দিলে মুনাফা না দেওয়া হলে এটি আমানত চুক্তি ভঙ্গের আওতায় পড়বে। এতে মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে। তারা মনে করেন, ন্যায্য ও স্বচ্ছ সমাধান না হলে ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট আরও বাড়তে পারে।
ব্যাংক খাতে বিনিয়োগ হারানোর ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এবার এনবিএফআই খাতেও বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক রেগুলেশন কাঠামোর আওতায় ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা আসার পর ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৫ সালে ব্যাংক রেগুলেশন অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। এতে ওই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডিং কার্যত শূন্য ঘোষণা করা হয়। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওই ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগকারীদের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার শেয়ারমূল্য এক ধাক্কায় নিশ্চিহ্ন হয়।
এ ক্ষতির ক্ষত সংশোধন না হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা এবার এনবিএফআই খাতেও একই পরিণতির আশঙ্কা করছেন।
৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শুধু আভিভা ফিন্যান্স পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। বাকি আটটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, যেখানে স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের অভিহিত মূল্য হিসেবে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিতে থাকা মূলধনের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। বাস্তবে বাজারদর বিবেচনায় ক্ষতির অঙ্ক আরও বড় হতে পারে।
পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মহসিন বলেন, পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য করার পর আবার যদি ৯ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হাত দেওয়া হয় তাহলে এটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। লাখো বিনিয়োগকারী পথের দিকে বসে যাবে। একের পর এক কম্পানি বন্ধ হলে আমরা পথের ফকির হয়ে যাব। তাই আমরা রাজনৈতিক সরকার আসার আগ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন চাই না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এনবিএফআই খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশই এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের দখলে। গত অর্থবছর শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা, যা খাতের গভীর কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন।
অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে মোট ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার আমানত আটকে আছে। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা, আর ব্যাংক ও করপোরেট আমানত ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।
ব্যক্তি আমানত সবচেয়ে বেশি আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা, আভিভা ফিন্যান্সে ৮০৯ কোটি টাকা, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি টাকা, প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা, এফএএস ফিন্যান্সে ১০৫ কোটি টাকা।
পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারী সামিয়া বিনতে মাহবুব বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আমাদের টাকার জন্য ঘুরছি। কতজনের কাছে যে গেছি তার কোনো ঠিক নেই। কারণ আমার পেটের টিউমার অপারেশন করাতে দ্রুত টাকা প্রয়োজন। এখন শুনছি পিপলস লিজিংসহ মোট ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করা হবে। আর আমানতকারীদের দায়িত্ব নেবে সরকার। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সব আমানতকারী টাকা ফেরত পাবে বলে আমি বিশ্বাস করতে চাই।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের বিনিয়োগকারী আবু সালেহ বলেন, ২০১৮ সালে আমার বাবার পেনশনের টাকা এখানে রেখে খুবই বিপদে পড়ে গেছি। এখন আর সেই টাকা ফেরত পাচ্ছি না। অন্যের দুর্নীতির দায় এখন আমাদের কাঁধে এসে পড়েছে। যেকোনো মূল্যে আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের কারণ হলো দুর্নীতি ও লুটপাট। আর লুটপাটের পেছনে পরিচালকদের হাত ছিল। ওই সব পরিচালকের যে সম্পদ আছে সেগুলো জব্দ করার পর নিলামে তুললে প্রতিষ্ঠানগুলো সমস্যায় পড়ত না।
তিনি বলেন, শুধু আসল টাকা ফেরত দিলে চুক্তি ভঙ্গ হবে। আর এই চুক্তি ভঙ্গ হলে দেশের অন্যান্য সব আইনকানুন বাতিল হয়ে যাবে বা প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকে যাবে। চুক্তিতে যদি নির্দিষ্ট হারে সুদ দিতে বলা থাকে, তাহলে আমানতকারীদের সেটা দিতেই হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও শেয়ারহোল্ডার ও করপোরেট আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র ৯টি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলেও সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








