মিশরকে হারিয়ে বিশ্বকাপ প্রস্তুতি শেষ করল ব্রাজিল
ছবি: সংগৃহীত
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নামার আগে নিজেদের শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠে নেমেছিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে অবস্থিত হান্টিংটন ব্যাংক ফিল্ড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই হাইভোল্টেজ আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে আফ্রিকান পরাশক্তি মিশরকে ২-১ ব্যবধানে পরাজিত করেছে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। প্রায় ৬৪ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে টানটান উত্তেজনায় ভরপুর এই ম্যাচে ব্রাজিলের হয়ে জয়সূচক গোল দুটি করেন ব্রুনো গিমারায়েস ও তরুণ ফরোয়ার্ড এন্দ্রিক। অন্যদিকে মিশরের পক্ষে একমাত্র সান্ত্বনাসূচক গোলটি করেন মোস্তফা জিকো। বিশ্বকাপের মহারণে নামার আগে এই জয়ের ফলে টানা তিন ম্যাচ জয়ের ধারা বজায় রাখল সেলেসাওরা। এর আগে তারা ক্রোয়েশিয়া এবং পানামাকে (৬-২ গোলে) হারিয়েছিল। ফলে একরাশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই হেক্সা মিশন (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়) শুরু করতে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তি।
এই ম্যাচের মূল আকর্ষণ ছিল দলের অভ্যন্তরীণ গভীরতা ও কৌশলগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। গত মে মাসের শেষ দিকে পায়ের পেশিতে চোট পাওয়ার কারণে এই ম্যাচেও স্কোয়াডের বাইরে ছিলেন ব্রাজিলের পোস্টার বয় নেইমার। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে তার অনুপস্থিতি খুব একটা টের পেতে দেননি বাকিরা।
অন্যদিকে, গত সপ্তাহে প্রীতি ম্যাচে রাশিয়াকে হারিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে থাকা মিশরও শুরু থেকে চোখে চোখ রেখে লড়াই করে। ম্যাচটিতে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি তার স্কোয়াডের অধিকাংশ খেলোয়াড়কে মাঠে নামিয়ে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ঝালিয়ে নেন। একই দিনে ব্রাজিলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাও তাদের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে হন্ডুরাসকে ২-০ গোলে হারিয়ে শুভসূচনা করেছে, যেখানে আলবিসেলেস্তেদের হয়ে গোল করেন লাওতারো মার্তিনেজ ও গিলিয়ানো সিমিওনে। তবে ব্রাজিলের জন্য এই জয়টি ছিল নিখাদ এক আত্মবিশ্বাসের উৎস।
খেলার শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছন্দে খেলতে থাকে ব্রাজিল। বিশেষ করে বার্সেলোনা তারকা রাফিনহার একের পর এক চোখধাঁধানো আক্রমণ মিশরের রক্ষণভাগে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ম্যাচের সপ্তম মিনিটে প্রথম সাফল্য পায় সেলেসাওরা। মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইরের একটি দুর্বল ক্লিয়ারেন্স থেকে বল পেয়ে ডি-বক্সের সামনে কিছুটা অসতর্ক ছিলেন মিডফিল্ডার মোহানাদ লাশিন। সেই সুযোগে তার পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে দুর্দান্ত এক কোণাকুণি শটে বল জালে জড়িয়ে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ব্রুনো গিমারায়েস। তবে ব্রাজিলের এই আনন্দের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। ম্যাচের ১১তম মিনিটে ব্রাজিলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার তথা পিএসজি তারকা মার্কিনহোসের একটি শিশুতোষ ও আত্মঘাতী ব্যাকপাস মাঝপথে রুখে দেন মিশরের মোস্তফা জিকো। কোনো ভুল না করে ঠান্ডা মাথায় অ্যালিসনকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান জিকো, যা দেশের জার্সিতে তার টানা দ্বিতীয় গোল।
আরও পড়ুন: ইউরোপের বুকে প্রথম জয়, ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
১-১ সমতায় ফেরার পর ম্যাচের ২০ মিনিটের মাথায় বড় ধাক্কা খায় ব্রাজিল শিবির। চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন রাইট-ব্যাক ওয়েসলি ফ্রাঙ্কা, যা কোচ আনচেলত্তির কপালে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। তবে সেই ধাক্কা সামলে প্রথমার্ধের বাকিটা সময় বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণে আধিপত্য বিস্তার করে খেলে ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনহা ও ইগর থিয়াগোর বেশ কয়েকটি নিশ্চিত শট দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দিয়ে মিশরকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তাদের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। বিরতির ঠিক আগ মুহূর্তে ডি-বক্সে ভিনিসিয়ুসকে মিশরের ডিফেন্ডার মোহামেদ হানি ফাউল করলে ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা পেনাল্টির জোরালো আবেদন জানান। তবে ভিএআর (VAR) চেকের পর রেফারি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নাকচ করে দিলে ১-১ সমতা নিয়েই প্রথমার্ধ শেষ হয়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ফুটবলীয় কৌশলে বড়সড় পরিবর্তন আনেন কার্লো আনচেলত্তি। পুরো স্কোয়াডকে পরখ করে দেখার লক্ষ্যে তিনি একসঙ্গে আটটি পরিবর্তন আনেন। নিয়মিত একাদশের আলিসন, মার্কিনহোস, ক্যাসেমিরো, পাকুয়েতা, ব্রুনো গিমারায়েস, ভিনিসিয়ুস ও ইগর থিয়াগোকে তুলে নিয়ে মাঠে নামানো হয় ওয়েভারটন, ব্রেমার, লিও পেরেইরা, দানিলো, ফাবিনহো, অ্যালেক্স সান্দ্রো, লুইজ হেনরিকে, ম্যাথিউস কুনিয়া এবং তরুণ তুর্কি এন্দ্রিককে।
অন্যদিকে সমতা ভাঙতে মিশরও মাঠে নামায় তাদের সবচেয়ে বড় তারকা মোহাম্মদ সালাহকে। কোচের এই সাহসী চালের সুফল ব্রাজিল হাতেনাতে পায় ম্যাচের ৫২তম মিনিটে। বাঁ-দিক থেকে রাফিনিয়ার চমৎকার ড্রিবলিং ও নিখুঁত নিচু ক্রস ডি-বক্সের ঠিক মাঝখানে খুঁজে নেয় ১৯ বছর বয়সী বিস্ময় বালক এন্দ্রিককে। চমৎকার এক প্রথম ছোঁয়ার (ফার্স্ট-টাইম) নিখুঁত ফিনিশিংয়ে জোরালো শটে লক্ষ্যভেদ করেন এই তরুণ স্ট্রাইকার। তার এই নান্দনিক গোলটিই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।
ম্যাচের শেষভাগে সমতা ফেরানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মিশর। দ্বিতীয়ার্ধে নামা মোহাম্মদ সালাহ দূরপাল্লার একটি ডিফ্লেক্টেড শটে চেষ্টা করলেও তা বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। শেষ ১০ মিনিটে সালাহ ও জিকোর বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণ ব্রাজিলের নতুন রক্ষণভাগ এবং বদলি গোলরক্ষক ওয়েভারটন দারুণ দক্ষতায় নসাৎ করে দেন। ম্যাচের শেষদিকে বার্সেলোনার যুব দলে যোগ দেওয়া মিশরের ১৮ বছর বয়সী তরুণ হামজা আবদেলকারিম মাঠে নেমে একটি সুবর্ণ সুযোগ পেলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। নির্ধারিত সময় শেষে অতিরিক্ত ৫ মিনিটেও মিশরের আক্রমণভাগ ব্রাজিলের অটুট ডিফেন্স ভাঙতে পারেনি। ফলে ২-১ ব্যবধানের স্বস্তিদায়ক জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
বিশ্বকাপের মূল পর্বে গ্রুপ ‘সি’-তে খেলবে ব্রাজিল, যেখানে তাদের অন্য তিন প্রতিপক্ষ মরক্কো, হাইতি ও স্কটল্যান্ড। আগামী ১৩ জুন (বাংলাদেশ সময় ১৪ জুন ভোর) মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে হেক্সার মিশন শুরু করবে সেলেসাওরা। অন্যদিকে এই ম্যাচে হারলেও বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’-তে বেলজিয়াম, ইরান ও নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিজেদের শক্তি ও দুর্বলতা ভালোভাবেই যাচাই করে নিয়েছে মিশর; যারা আগামী ১৫ জুন বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








