সাড়ে ছয় বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে প্রায় ৮ হাজার শিশুর
ফাইল ছবি
দেশের সড়কে নিরাপত্তাহীনতার নির্মম শিকার হচ্ছে শিশুরা। গত ছয় বছর নয় মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে রাস্তা পারাপার ও সড়কে হাঁটার সময় এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবেও প্রাণ গেছে হাজারো শিশুর। দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে এবং নিহত শিশুদের বড় অংশই কিশোর বয়সী।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটি। এ জন্য ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজস্ব তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন, অর্থাৎ ৩৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ছিল। পথচারী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৮১২ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। আর বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে নিহত হয়েছে ২ হাজার ১৯৩ শিশু, অর্থাৎ ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান বলছে, মোটরসাইকেল চলাচল, পথচারীদের নিরাপত্তা এবং শিশুদের যাতায়াতব্যবস্থা তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
পথচারী শিশুদের জন্য বিপজ্জনক থ্রি-হুইলার ও ভারী যান
সড়কে হাঁটতে গিয়ে কিংবা রাস্তা পারাপারের সময়ও বিপুলসংখ্যক শিশুকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে পথচারী হিসেবে নিহত ২ হাজার ৮১২ শিশুর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত যানবাহনের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শিশু প্রাণ হারিয়েছে থ্রি-হুইলারের ধাক্কায়। সিএনজি, অটোরিকশা, নসিমন ও ভটভটির মতো যানবাহনের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ২৭১ শিশু, যা পথচারী হিসেবে নিহতদের ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।
এ ছাড়া বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় প্রাণ গেছে ১ হাজার ১২৬ শিশুর। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় নিহত হয়েছে ৩১৭ শিশু। মোটরসাইকেলের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে আরও ৯৮ শিশু। অর্থাৎ পথচারী শিশুদের মৃত্যুর পেছনে একাধিক ধরনের যানবাহন জড়িত থাকলেও তিন চাকার যান ও ভারী যানবাহনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গ্রামীণ সড়কেই প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি
সড়কের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিশু মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে গ্রামীণ সড়কে। এসব সড়কে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ৭১৩ শিশু, যা মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ০৭ শতাংশ। আঞ্চলিক সড়কে নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮২ শিশু, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশু।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়কে বসতবাড়ির কাছ দিয়ে যানবাহন চলাচল, ট্রাফিক নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করা এবং সড়ক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির ঘাটতি শিশুদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাড়ির আশপাশের সড়কেই শিশুদের চলাফেরা ও খেলাধুলা করতে হয়। অথচ এসব সড়কে নিরাপদে চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে না। সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে শিশুদের অজ্ঞতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
বিকেল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের সময় বাড়তি ঝুঁকি
দিনের কোন সময়ে শিশুদের বেশি প্রাণহানি ঘটছে, সেই হিসাবেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিকেলে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৬৩৪ শিশু নিহত হয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ। সকালে প্রাণ হারিয়েছে ২ হাজার ১৬৮ শিশু এবং দুপুরে ১ হাজার ৮১৩ শিশু। এ ছাড়া রাতে ৫৯৮, সন্ধ্যায় ৫৪৬ এবং ভোরে ২০৪ শিশু নিহত হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সময়ও শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য। এই সময়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ২ হাজার ৫১৩ শিশুর, যা মোট মৃত্যুর ৩১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। অন্যদিকে বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলাধুলার সময় দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৯৬২ শিশু। এসব তথ্য শিশুদের দৈনন্দিন যাতায়াত ও বাড়ির আশপাশের চলাচল নিরাপদ করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
আরও পড়ুন: ১৮ বছরের আগেই হচ্ছে ৪৭.২ শতাংশ নারীর বিয়ে: ইউনিসেফ
নিহতদের বড় অংশ ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী
বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বয়সসীমায় প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ৫৪৭ জন, যা মোট মৃত্যুর ৪৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী নিহত হয়েছে ২ হাজার ৮৮৪ শিশু বা ৩৬ দশমিক ২১ শতাংশ। আর শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যা মোট মৃত্যুর ১৯ দশমিক ২৩ শতাংশ।
বয়সভিত্তিক এই চিত্রে কিশোরদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। এই বয়সে অনেকেই মোটরসাইকেল চালানো বা তাতে যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত হয়। তবে প্রতিবেদন থেকে নিহত কিশোরদের কতজন চালক এবং কতজন আরোহী ছিল, তার পৃথক হিসাব পাওয়া যায়নি। ফলে বয়স ও যানবাহনভিত্তিক তথ্য একত্র করে নির্দিষ্ট কোনো কারণকে এককভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই।
শিশুমৃত্যুর পেছনে ছয়টি কারণ চিহ্নিত
শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এগুলো হলো—সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা শিশুবান্ধব না হওয়া, নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে শিশুদের সচেতনতার অভাব, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ না দেওয়া, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো, দুর্ঘটনায় আহত শিশুদের উপযুক্ত চিকিৎসার সংকট এবং চিকিৎসার ব্যয় বহনে পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা।
সংস্থাটির মতে, দুর্ঘটনার পর যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সুযোগ ও সক্ষমতা সীমিত থাকলে আহত শিশুদের চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হতে পারে। আর পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে চিকিৎসা ব্যাহত হলে দুর্ঘটনার ক্ষতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিশুদের নিরাপত্তায় ছয় দফা সুপারিশ
শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও হতাহতের ঘটনা কমাতে সড়ক ও পরিবহনব্যবস্থা নিরাপদ এবং শিশুবান্ধব করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে শিশুদের সচেতন করা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের যানবাহন চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার সুযোগ ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বিশেষ সরকারি তহবিল গঠনের সুপারিশও করা হয়েছে। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্বেগ ও সাধারণ মানুষের সচেতনতার ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ, সড়ক ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। প্রতিটি শিশুর মধ্যেই বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, শিশুদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব শুধু তাদের পরিবারের জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাই শিশুদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সড়ক ব্যবস্থাপনা, চালকদের জবাবদিহি, চিকিৎসাসেবা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা সব ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








