‘ধর্ম যার যার, পরিচয় সবার বাংলাদেশি’
ছবি: সংগৃহীত
ধর্মীয় পরিচয় নয়, জাতীয় পরিচয়ই সব নাগরিকের প্রধান ও একমাত্র ঠিকানা বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ধর্মীয় পরিচয় যার যার নিজস্ব বিষয়, কিন্তু জাতীয় পরিচয়ে বাংলাদেশের সব নাগরিক সমান। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার অভিন্ন পরিচয় বাংলাদেশি।
তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু বলে কোনো বিভাজন থাকা উচিত নয়; সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটি নতুন ও সাম্যভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
রাষ্ট্রের আইন ও নাগরিক অধিকার সবার জন্য সমান উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জে জেএমসেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে শুভেচ্ছা জানান এবং জাতীয় ঐক্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান।
প্রায় তিন দশক পর বিএনপি চেয়ারপারসনের পরিবারের কোনো শীর্ষ নেতার এই চট্টগ্রাম সফর ঘিরে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। এর আগে ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চট্টগ্রাম এসেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ আমি আপনাদের এখানে উপস্থিত হয়েছি এতটুকু বলার জন্য যে, এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার, এই দেশ আমাদের সকলের। আমরা মুসলমান হই, আমরা হিন্দু হই, বৌদ্ধ যেই হই না কেন, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকটি মানুষ বাংলাদেশি।
সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু পরিচয়ের বিভাজনকে গুরুত্ব না দিয়ে নাগরিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান। রাষ্ট্র একজন নাগরিককে যে অধিকার দেবে, অন্য নাগরিকও সেই অধিকার পাবেন। দেশের আইন তাঁর নিজের জন্য যেমন প্রযোজ্য, তেমনি অন্য সবার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। তাই ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
নিজের বিদেশে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাকে ১৭ বছর বিদেশে থাকতে হয়েছে। মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশ হলেও লন্ডনে থাকার সময় তিনি সংখ্যালঘু অবস্থানে ছিলেন।
এ অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘু হওয়া মুখ্য বিষয় নয়; প্রত্যেকের প্রধান পরিচয় তিনি বাংলাদেশের নাগরিক।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। সেই সংগ্রামে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অংশ নিয়েছেন এবং অনেকে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান তা বিবেচনা করা হয়নি। সবার লক্ষ্য ছিল দেশকে স্বাধীন করা। মুক্তিযুদ্ধের সেই ঐক্য ও চেতনা নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রেও ধারণ করতে হবে।
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য ছিল না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তার ভাষ্য, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমেছেন। তাঁদের পরিচয় নির্ধারণে ধর্ম নয়, বরং গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই প্রধান ছিল।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ওই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মানুষ, নারী ও শিশুরাও অংশ নিয়েছিলেন। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ কিংবা আহত ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় কেউ জানতে চাননি। হাসপাতালে নেওয়া বা চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি।
তার মতে, এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সংকট ও সংগ্রামের সময়ে মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিক সত্তা এবং দেশের নাগরিকত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন এবং জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান সব ক্ষেত্রেই মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণের বিভেদ ভুলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে ধর্মের নামে কোনো বিভাজন যেন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আরও পড়ুন: তিস্তা-পদ্মায় ব্যারাজ, ৪৬ কারখানা চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
দেশ পরিচালনায় সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতা কামনা করে তারেক রহমান বলেন, একটি সুন্দর ও স্বাবলম্বী দেশ গড়ে তোলা কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে সম্ভব নয়। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব নাগরিকের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে প্রত্যেকে সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করতে পারবেন এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কেউ বৈষম্যের শিকার হবেন না।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি। এ সময় পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে একটি বনসাই গাছ ও স্মারক উপহার দেন। পূজামণ্ডপের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী পরিষদের নেতাদের হাতে ২০ লাখ টাকার অনুদানের চেক তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক নৃত্য পরিবেশন করা হয়।
মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিজন কান্তি সরকার। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ও মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনসহ চট্টগ্রাম নগর ও জেলার সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় একটি সামরিক বিমানে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে বিএনপির মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। পরে সড়কপথে রাত সোয়া ৮টার দিকে তার গাড়িবহর জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপে পৌঁছায়। পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতারা ফুল দিয়ে তাকে বরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সন্ধ্যার আগে থেকেই রহমতগঞ্জের পূজামণ্ডপের আশপাশে বিএনপির নেতা-কর্মীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রবেশসড়কের দুই পাশে যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশি নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্য দিয়ে পূজার্থী ও দর্শনার্থীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হয়।
জেএম সেন হলের অনুষ্ঠান শেষে রাত পৌনে ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী নগরের র্যাডিসন ব্লু হোটেলের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তাঁর সাংগঠনিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি ছিল।
উল্লেখ্য, ১৯৯৩ সালে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চট্টগ্রামে এসেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। প্রায় তিন দশক পর তাঁর ছেলে তারেক রহমান চট্টগ্রামের জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








