আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২১:২২, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সৌদির আকাশ রক্ষায় টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য

সৌদির আকাশ রক্ষায় টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য

ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সৌদি আরবের শহর, বেসামরিক জনগোষ্ঠী ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় অত্যাধুনিক টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। 

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়। 

নতুন এই পদক্ষেপের আওতায় রয়্যাল এয়ারফোর্সের (আরএএফ) যুদ্ধবিমান সৌদি আকাশসীমায় প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করবে। পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে একটি এ৪০০এম পরিবহন বিমান এবং সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টা পাঠানো হবে। তবে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানগুলো হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণাত্মক অভিযানে অংশ নেবে না বলে স্পষ্ট করেছে লন্ডন।

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামোকে আকাশপথের হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে টাইফুন যুদ্ধবিমান দিয়ে প্রতিরক্ষামূলক আকাশ টহল পরিচালনা করা হবে। এর লক্ষ্য সৌদি ভূখণ্ডের দিকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি মোকাবিলা করা। 

দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর হুতিদের অব্যাহত হামলা নিন্দনীয় এবং বিশেষ করে রিয়াদের বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। 

তার ভাষ্য, নতুন সামরিক সহায়তা সৌদি আরবের আকাশসীমা সুরক্ষায় দেশটিতে আগে থেকেই মোতায়েন করা ব্রিটিশ সামরিক সরঞ্জাম ও সদস্যদের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করবে।

যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় দেশটির বিদ্যমান সামরিক সহায়তার পরিধি আরও বাড়ল। এর আগে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ এবং দেশটির প্রতিরক্ষামূলক বিমান অভিযানে মাঝআকাশে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিল ব্রিটেন। নতুন ঘোষণায় এই জ্বালানি সরবরাহের মেয়াদ আরও ৯০ দিন বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরবের ভেতরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম পরিবহনে সহায়তার জন্য ভারী মালামাল বহনে সক্ষম আরএএফের এ৪০০এম বিমান ব্যবহার করা হবে। সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন ব্রিটিশ সামরিক উপদেষ্টারাও। গত সেপ্টেম্বর মাসে হুতিদের হামলা বৃদ্ধির পর সৌদি আরবকে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষামূলক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিল যুক্তরাজ্য। তবে এবারের সিদ্ধান্তে সরাসরি টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বেড়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা এবং জ্বালানি পরিবহন অবকাঠামো রয়েছে। চলতি মাসে রিয়াদের বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলার কারণে ফ্লাইট চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে। এ ছাড়া সৌদি আরামকোর ধাহরান সদর দপ্তর এবং দেশটির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিস্তৃত একটি তেল পাইপলাইনও চলমান সংঘাতের মধ্যে হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পর সৌদি আরবের আকাশ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন: হুতিদের হামলার মুখে সৌদির বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত

সৌদি আরবকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনের ভেতরেও সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব, অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলন সরকারবিরোধী সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সদস্যদের ওপরও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। 

সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইয়েমেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৫৮ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। হামলায় হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য থাকলেও ঘটনাটি সংঘাতের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে। এর জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীও ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। ফলে একদিকে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে ইয়েমেনের অভ্যন্তরে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান সব মিলিয়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই সংঘাতের প্রভাব কেবল সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রশ্নও। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এই অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরির আশঙ্কা থাকে। 

ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও সতর্ক করেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সহিংসতা বাড়তে থাকলে জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যার পরিণতিতে যুক্তরাজ্যের পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে পারে। লন্ডনের এই উদ্বেগের পেছনে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নিজস্ব অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাস্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তবে সামরিক সহায়তা বাড়ালেও ইয়েমেন সংকটের স্থায়ী সমাধান যে কেবল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সম্ভব নয়, সে অবস্থানও জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। 

ব্রিটিশ সরকারের মতে, দেশটিতে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে ইয়েমেনের বেসামরিক জনগণের ওপর যে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে লন্ডন। নতুন করে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েনের ফলে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা কতটা কার্যকর হয় এবং এর মধ্য দিয়ে সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয় কি না, তা এখন পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথের ওপর নির্ভর করছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়