প্রাথমিক শিক্ষায় পাঁচ খাতে সংস্কার, লক্ষ্য জিডিপির ৫% বরাদ্দ
ছবি: সংগৃহীত
প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন ও বিদ্যমান সংকট দূর করতে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি এই পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম চালু, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যালয় পরিদর্শনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিশুবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন হোটেলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের যৌথ আয়োজনে ফ্রম দ্য ফিল্ড টু রিফর্ম: অ্যাডভান্সিং প্রাইমারি এডুকেশন ইন বাংলাদেশ শীর্ষক জাতীয় সংলাপ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় কর্মশালায় এসব পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের কথা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্র পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ফলে একটি খাতে উন্নয়ন ঘটিয়ে অন্য খাতগুলোকে উপেক্ষা করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনা চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
তার ভাষ্য, প্রতিটি শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিখনের মান, নৈতিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনকে সংস্কার কার্যক্রমের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, গত কয়েক মাসে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তা, বিদ্যালয় তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে ৬০ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়েছে। তিন হাজারের বেশি অংশীজনের মতামত ও অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি মনিটরিং কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা এবং দেড় হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব আলোচনা থেকে বিদ্যালয় পরিচালনা, পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষকস্বল্পতা, তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি নতুন কারিকুলাম। ববি হাজ্জাজ বলেন, ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্যে শিখনফলভিত্তিক ও শিশুবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে। এতে বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি খেলনাভিত্তিক শিক্ষা, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু শেষ করাকেই শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য না ধরে শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে এবং অর্জিত জ্ঞান কতটা প্রয়োগ করতে পারছে, সেদিকে নজর দেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিদ্যালয়ভেদে শিখন-সময়ের বৈষম্য কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি সব প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় মানদণ্ড নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের দলভিত্তিক আলোচনা, পারস্পরিক অংশগ্রহণ এবং সক্রিয়ভাবে শেখার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও সংস্কার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কারিকুলামের লক্ষ্য অর্জনে পাঠ্যক্রম প্রণয়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত শিক্ষক, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা উপকরণ ও কার্যকর মূল্যায়নব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ববি হাজ্জাজ জানান, শিক্ষক নিয়োগ, প্রাক্-চাকরি প্রশিক্ষণ, পদায়ন, পেশাগত উন্নয়ন ও মূল্যায়নকে সমন্বিত করে একটি শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বাড়ানো এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের মূল্যায়ন পৃথক রাখা এবং উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষক প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
আরও পড়ুন: নতুন পে-স্কেলের মধ্যেই প্রাইমারির প্রধান শিক্ষকদের বেতন বাড়াল সরকার
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা, বেতন-ভাতা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আগামী দুই বছরে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের প্রস্তুতির পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা, শিক্ষকস্বল্পতা দূর করা এবং তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যালয় পরিদর্শন ও মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, মাঠপর্যায়ে জনবলসংকট এবং অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজের চাপের কারণে বিদ্যালয় তদারকি কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে ১১ ধাপের বিদ্যালয় পরিদর্শন পদ্ধতি এবং ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, মনিটরিংয়ের উদ্দেশ্য শুধু প্রতিবেদন তৈরি বা প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা নয়; বরং শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকছেন কি না, যথাযথভাবে পাঠদান করছেন কি না এবং শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রকৃতপক্ষে শিখতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে একদিকে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, অন্যদিকে শিক্ষকদের অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ কমানো সম্ভব হয়।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন বলতে শুধু নতুন ভবন নির্মাণকে বোঝায় না এমন মন্তব্য করে ববি হাজ্জাজ বলেন, শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের উপযোগী হতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ি অঞ্চলসহ ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ এলাকার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষকদের কাজ সহজ করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ ও মান বাড়ানো সম্ভব হবে। জাতীয় সংলাপে উঠে আসা সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, সরকার পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম অর্থবছরেই এ খাতে জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি তা যথাযথভাবে ব্যবহার করে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, শিক্ষকস্বল্পতা দূর করা এবং ঝরে পড়া কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবিষয়ের ব্যাপ্তি বাড়ানোর পরিবর্তে শিখনের গভীরতা ও গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দলভিত্তিক আলোচনা ও পারস্পরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে শেখার সুযোগ বাড়ালে শিক্ষার্থীরা বিষয়বস্তু ভালোভাবে বুঝতে এবং অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারবে। প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার সফল করতে শিক্ষক, কারিকুলাম, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনাগত সক্ষমতার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. মোক্তার আলী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য রেজা কিবরিয়া ও বীথিকা বিনতে হোসাইন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন এবং গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী। জাতীয় সংলাপে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।
প্রাথমিক শিক্ষার সংস্কার পরিকল্পনায় পাঁচটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঘোষণা সরকারের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সময়মতো প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ, দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি বাড়ানো এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিক অগ্রগতির ওপর। নতুন কারিকুলাম থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের নিরাপদ পরিবেশ প্রতিটি উদ্যোগের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে শিশুরা কতটা শিখছে এবং তাদের জন্য শিক্ষার সুযোগ কতটা সমতাভিত্তিক হচ্ছে, তার ভিত্তিতেই।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








