যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড ৩ লাখের বেশি ভিসা বাতিল করলো ট্রাম্প প্রশাসন
ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তিন লাখেরও বেশি বিদেশি নাগরিকের ভিসা বাতিল করেছে তার প্রশাসন। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, জালিয়াতি, অভিবাসন আইন লঙ্ঘন এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে এসব ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, দেশটির ইতিহাসে অন্য যেকোনো প্রশাসনের তুলনায় দ্রুতগতিতে ভিসা বাতিলের এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এ তথ্য জানান। খবর আল-জাজিরা ও রয়টার্সের।
পিগট বলেন, ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত যেসব বিদেশি নাগরিক আইন ভঙ্গ করেছেন, প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন কিংবা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা এবং দেশটির নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভিসা বাতিলের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। পররাষ্ট্র দপ্তরের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির আরেকটি দিক সামনে এসেছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাতিল হওয়া ভিসার সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছিল। সে সময় এটিকে রেকর্ড হিসেবে উল্লেখ করে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। পরে গত আগস্টে ভিসা বাতিলের সংখ্যা এক লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সর্বশেষ হিসাবে তা তিন লাখ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, কয়েক মাসের ব্যবধানে ভিসা বাতিলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
প্রশাসনের দাবি, আইন প্রয়োগ, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ভিসা বাতিলের কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সহিংস অপরাধ, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বা বিতরণের মতো কর্মকাণ্ড।
আরও পড়ুন: দায়িত্ব নেওয়ার ৫ দিনের মাথায় বরখাস্ত হলেন ট্রাম্পের নতুন প্রেস সচিব
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া অপরাধভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাতিল হওয়া ভিসার প্রায় ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে হামলা ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের রেকর্ড ছিল। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে বাতিল করা হয় ২২ শতাংশ ভিসা। এ ছাড়া চুরির ঘটনায় ৭ শতাংশ এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বা বিতরণসংক্রান্ত কারণে আরও ৭ শতাংশ ভিসা বাতিল করা হয়। তবে এসব পরিসংখ্যান ২০২৫ সালের বাতিলের হিসাবসংক্রান্ত; এগুলোকে সাম্প্রতিক তিন লাখ ভিসার সম্পূর্ণ অপরাধভিত্তিক বিভাজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে ভ্রমণকারী বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ ধরনের ভ্রমণকে বার্থ ট্যুরিজম বা জন্ম পর্যটন বলা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা কিংবা এতে সহায়তা করার অভিযোগে চার হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
প্রশাসনের ভাষ্য, ভিসার শর্ত ও প্রচলিত বিধিবিধানের অপব্যবহার রোধ করতেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
শুধু বিদ্যমান ভিসা বাতিল নয়, নতুন ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করেছে ওয়াশিংটন। আবেদনকারীদের অতীত কর্মকাণ্ড ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের কার্যক্রমও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং ভিসার অপব্যবহার ঠেকানোই এ নীতির লক্ষ্য বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই কঠোর অভিবাসন নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত নজরদারি মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। পাশাপাশি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা এবং অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এড়ানোর বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। বিশেষ করে, নিরাপত্তার যুক্তিতে কোনো ব্যক্তির মতামত বা অনলাইন কর্মকাণ্ডকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, দেশটির আইন লঙ্ঘনকারী এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








