আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৯:৩৭, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সহিংসতা দমনে ফ্রান্সে কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি

সহিংসতা দমনে ফ্রান্সে কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তুতি

ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবনতিশীল পরিস্থিতি ও জনসেবার মান নিয়ে চলমান বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আংশিক কারফিউ জারির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দেশটির বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট, সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ জারির ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও পুলিশি প্রস্তুতির ঘাটতি খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আপাতত দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা বা রাজধানী প্যারিসে পূর্ণাঙ্গ কারফিউ জারির পরিকল্পনা নেই সরকারের।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু জানান, জননিরাপত্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে আংশিক ও এলাকাভিত্তিক কারফিউ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

তার ভাষায়, সরকার জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রয়োজন হলে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে কারফিউ জারিই অধিক উপযোগী। কোন কোন শহর বা এলাকায় কখন থেকে এই বিধিনিষেধ কার্যকর হবে, তা স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারণ করা হবে। 

লেকর্নু স্পষ্ট করেছেন, পুরো প্যারিসকে কারফিউর আওতায় আনার প্রশ্ন নেই। সরকারের লক্ষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সহিংসতা ও লুটপাট নিয়ন্ত্রণ করা।

এর আগে রবিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাখোঁ সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্সেই শহরে সোমবার দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সব ধরনের জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়। সরকারের এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক ক্ষমতা আরও জোরদার করা হলেও জনঅসন্তোষের মূল কারণগুলো মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুরবস্থা এবং জনসেবার মান নিয়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। 

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওই দিন প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। তবে আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও বেশি ছিল। কয়েক সপ্তাহ আগে প্যারিসের দরিদ্র ও শ্রমজীবী অধ্যুষিত এলাকায় হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। শিক্ষক অনুপস্থিতি ও বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া সেই প্রতিবাদ ধীরে ধীরে বৈষম্য, সরকারি ব্যয় সংকোচন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। শনিবারের কর্মসূচির শুরুতে অনেক বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিভিন্ন শহরে একপর্যায়ে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট ছড়িয়ে পড়ে।

রাজধানী প্যারিস ছাড়াও লিওঁ, মার্সেই, লিমোজ ও বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। মুখোশধারী একদল ব্যক্তি দোকানপাটে হামলা চালিয়ে মূল্যবান পণ্য লুট করে এবং সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনায় আগুন দেয়। মধ্যাঞ্চলীয় লিমোজ শহরে ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত ঐতিহাসিক নগর ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভবনটির ছাদ আংশিক ধসে পড়ে। প্যারিসে একাধিক দোকান ও বিপণিবিতান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বোর্দোতেও বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লুটপাটের শিকার হয়। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সহিংসতার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নগর প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রমে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৬০ হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম মোতায়েন করা হয়েছিল। এত বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পরও সহিংসতা ঠেকাতে না পারায় সরকারের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেন, বড় শহরগুলোতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যর্থ হয়েছিল। 

তার মতে, বিক্ষোভের আড়ালে সক্রিয় দাঙ্গাবাজ ও লুটপাটকারীদের ব্যাপক তৎপরতা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। আগাম পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে রোববার পদত্যাগের প্রস্তাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ। তবে সোমবার প্রেসিডেন্ট মাখোঁ তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করেন। 

এলিসি প্রাসাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্ব ও কমান্ড কাঠামোয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্বে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সহিংসতার আগাম তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং পুলিশি প্রস্তুতিতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছেন মাখোঁ। দাঙ্গাবাজদের মোকাবিলা, ব্যারিকেড অপসারণ ও লুটপাট বন্ধে দ্রুত কার্যকর অভিযান পরিচালনার জন্য নতুন পদ্ধতি গ্রহণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিকভাবে মন্ত্রীর পদত্যাগের প্রশ্নটি নিষ্পত্তি হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক থামেনি।

আরও পড়ুন: ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতা, গ্রেফতার ২ হাজার ৪০০ জন

সহিংসতার ঘটনায় গ্রেফতারের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। 

বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে দুই হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জঁদার্ম সদস্য আহত হয়েছেন বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে। সংঘাতের মধ্যে এক বিক্ষোভকারীর হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। 

এ ছাড়া পুলিশের ব্যবহৃত স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। 

প্যারিসের সরকারি কৌঁসুলি লর বেকুয়োর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত রাজধানীতে প্রায় ১৩০ জনকে আটক করা হয়। তাদের সবাইকে লুটপাটের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়নি; অন্যান্য অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনার প্রক্রিয়া চলছে।

সহিংসতার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ফ্রান্সের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাবে, কয়েক হাজার দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলা, ভাঙচুর কিংবা লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় বিশেষ তহবিল গঠন এবং কর্মস্থল বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আয় হারানো ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করেছেন, তাদের কাছ থেকেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসক্যুরও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তীব্র হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু ও সরকারের কয়েকজন প্রতিনিধি সহিংসতার জন্য চরম বামপন্থি গোষ্ঠী এবং অপরাধীদের দায়ী করেছেন। 

তাদের অভিযোগ, এসব গোষ্ঠী আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। তবে এ অভিযোগের সমর্থনে বিস্তারিত প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের কেউ কেউ সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবার সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন আইনশৃঙ্খলা, সরকারের জবাবদিহি এবং নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রশ্নেও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

এদিকে সোমবার শিল্পকলার শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে প্যারিসের বিশ্বখ্যাত লুভর জাদুঘরের প্রধান প্রবেশপথে দর্শনার্থীদের চলাচল ব্যাহত হয়। একই সময়ে মার্সেইয়ে জমায়েত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। তবে মঙ্গলবার প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ ও বার্সেলোনার মধ্যকার নির্ধারিত ফুটবল ম্যাচ বাতিলের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শহরগুলোর মেয়ররা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে জবাবদিহি দাবি করেছেন। 

তাদের মতে, সহিংসতার মাত্রা ও বিস্তার মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হতো।

আগামী শনিবার আবারও রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতারা। তাদের ঘোষিত কর্মসূচির নাম অ্যাক্ট টু। ফলে নতুন করে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ফ্রান্স এমনিতেই অর্থনৈতিক চাপ, সরকারি ঋণ, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বিভাজনের মতো একাধিক সংকট মোকাবিলা করছে। এই পরিস্থিতিতে একদিকে সহিংসতা দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আন্দোলনের পেছনে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও জনসেবাসংক্রান্ত অভিযোগের কার্যকর সমাধান করা দুই চ্যালেঞ্জই এখন মাখোঁ সরকারের সামনে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়