আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১৪:০৬, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

নাজরানে সৌদি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে ২ ক্রু নিহত

নাজরানে সৌদি হেলিকপ্টার বিধ্বস্তে ২ ক্রু নিহত

ছবি: সংগৃহীত

সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় নাজরান এলাকায় একটি সামরিক নজরদারি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে দুই ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে এর আগেই ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা একই এলাকায় সৌদি আরবের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি করেছিল। ফলে হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি এক বিবৃতিতে জানান, বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি ছিল এএইচ-৬আই মডেলের একটি গোয়েন্দা ও নজরদারি বিমান। এটি সৌদি ন্যাশনাল গার্ড মন্ত্রণালয়ের অধীন ছিল। দুর্ঘটনায় নিহত দুই ক্রু সদস্যই কর্মকর্তা পদমর্যাদার ছিলেন। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটিকেই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ত্রুটির ধরন বা নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

এর আগে শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে কথিত শত্রুতামূলক অভিযান চালানোর সময় তাদের যোদ্ধারা সৌদি আরবের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছেন। তবে হুতিদের দাবি করা অ্যাপাচি এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের জানানো এএইচ-৬আই হেলিকপ্টারটি একই কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হুতিদের দাবির জবাবে আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সারিবদ্ধভাবে রাখা কয়েকটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের ছবি প্রকাশ করেন। 

পোস্টে তিনি লেখেন, আপনারা দাবি করছেন, এটি ভূপাতিত করেছেন। কিন্তু এটি শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্রে নামবে। 

তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হুতিদের হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানানো হলেও দুই পক্ষের বক্তব্যের অসংগতি পুরোপুরি দূর হয়নি।

এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, শনিবার রাতভর রাজধানী রিয়াদ, পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। একই সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহরের দিকে নিক্ষেপ করা হুতিদের দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবিও করেছে জোটটি। এসব হামলা ও প্রতিরোধের ঘটনা সৌদি ভূখণ্ডে নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: ইয়েমেনে হুতিদের হামলায় ১১ জনের মৃত্যু

নাজরানে হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়েছে। গত জুলাই থেকে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা বেড়েছে। হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম উঠে এসেছে। অন্যদিকে হুতিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় তাদের সামরিক অবস্থান ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। জোটের পক্ষ থেকে উত্তর ইয়েমেনের সাদা এলাকায় দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রে হামলার ভিডিও প্রকাশ করে সেগুলো ধ্বংসের দাবিও করা হয়েছে।

চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় প্রাণহানি ও ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলায় বেসামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশটির জ্বালানি খাত ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শিকড় ২০১৪ সালে, যখন হুথিরা রাজধানী সানা ও দেশটির আরও কয়েকটি এলাকা দখল করে নেয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট দেশটিতে অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে সেই সমঝোতার পরও রাজনৈতিক সমাধান ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের জুলাইয়ে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

ইয়েমেনের সংঘাত এখন আর দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরান-সমর্থিত হুথিদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সংঘর্ষ বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইয়েমেন নতুন করে সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক মানুষের জীবনযাত্রার ওপর আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নাজরানের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বললেও হুথিরা একই এলাকায় সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার দাবি করেছে। দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এই পার্থক্য এবং সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উত্তেজনার নতুন মাত্রা তুলে ধরছে। তবে হেলিকপ্টারটি ঠিক কী কারণে বিধ্বস্ত হয়েছে, হুতিদের দাবি করা বিমানটির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র কী এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এখনো সীমিত।

সূত্র: রয়টার্স

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়