আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১০:১৪, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর ইসরায়েলিদের হামলা

পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর ইসরায়েলিদের হামলা

ছবি: সংগৃহীত

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষকদের জলপাই সংগ্রহ কার্যক্রমে সংহতি জানাতে যাওয়া ইউরোপীয় কূটনীতিকদের একটি প্রতিনিধিদলের ওপর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। রামাল্লার তাইবেহ গ্রামে সংঘটিত এ ঘটনায় ফ্রান্সের এক মেয়রসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি ভাঙচুর করা হয়েছে বেলজিয়ামের একটি কূটনৈতিক গাড়ি। সাম্প্রতিক সময়ে অঞ্চলটিতে ফিলিস্তিনিদের ওপর উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফিলিস্তিনি কৃষকদের ঐতিহ্যবাহী জলপাই সংগ্রহ মৌসুমের কাজে যোগ দিতে তাইবেহ গ্রামে যান ইউরোপীয় প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। প্রতিনিধিদলটিতে জেরুজালেমে নিযুক্ত ফ্রান্সের কনসাল জেনারেল, বেলজিয়াম ও পোল্যান্ডের কূটনীতিক, ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং উত্তর ফ্রান্সের অলনোয়া-এমেরিস শহরের মেয়র বের্নার্ড বোদু উপস্থিত ছিলেন। 

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে মুখোসধারী একদল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী লাঠি ও লোহার রড নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হয়। ফরাসি লাল, সাদা ও নীল রঙের ফিতা পরা ৭৮ বছর বয়সী মেয়র বোদুকে লাথি মারা এবং মাটিতে ফেলে মারধর করা হয়। এ সময় হামলাকারীরা বেলজিয়ামের কূটনৈতিক মিশনের একটি সাঁজোয়া গাড়ির জানালা ভেঙে ফেলে এবং উপস্থিত লোকজনকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।

ঘটনার পর ফরাসি মেয়র বের্নার্ড বোদু গণমাধ্যমকে বলেন, বসতি স্থাপনকারীরা যেভাবে প্রকাশ্যে এ ধরনের সহিংসতা চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে এর পেছনে ইসরায়েল সরকারের মৌন সম্মতি ও প্রশ্রয় রয়েছে। 

বিশ্বের কাছে এখানকার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান, বিদেশি অতিথিরা নিজ দেশে ফিরে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারলেও স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের চরম দুর্ভোগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই দিন কাটাতে হচ্ছে। 

তাইবেহের গির্জার যাজক ফাদার বাশার ফাওয়াদলেহ উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে এ ধরনের নজিরবিহীন হামলা প্রমাণ করে যে স্থানীয় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

আরও পড়ুন: ইয়েমেনে হুতিদের হামলায় ১১ জনের মৃত্যু

এর আগে গত শুক্রবার রামাল্লার উত্তরে আবু ফালাহ এলাকায় জলপাই সংগ্রহের সংবাদ সংগ্রহ করার সময় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের নৃশংস মারধরের শিকার হন মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট'-এর আলোকচিত্রী হাইডি লেভিন। ওই হামলায় তার মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায় এবং পরবর্তীতে তাকে হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করতে হয়। পরপর দুদিনে সাংবাদিক ও কূটনৈতিক মহলে চালানো এসব হামলার ঘটনায় পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

এ ঘটনায় বিশ্বনেতারা ও সংশ্লিষ্ট দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী এই অপরাধমূলক সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করতে এবং জড়িত উগ্রপন্থীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ইসরায়েল সরকারের প্রতি কঠোর আহ্বান জানিয়েছেন। 

বেলজিয়ামের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, জলপাই সংগ্রহ, সংবাদ পরিবেশন কিংবা কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন কোনো কাজেই কাউকে হামলার মুখে পড়তে দেওয়া যায় না। ইসরায়েলের অবৈধ বসতি স্থাপন নীতি এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জোর দাবি জানান তিনি।

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে পুলিশ ইতোমধ্যে এই হামলার তদন্ত শুরু করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে হামলাকারীদের দাঙ্গাবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে একই সঙ্গে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, ইউরোপীয় প্রতিনিধিদলটি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোনো ধরনের পূর্বানুমতি বা সমন্বয় ছাড়াই ওই এলাকায় গমন করেছিল। 

যদিও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো স্পষ্ট জানিয়েছে যে, পশ্চিম তীরের সিংহভাগ এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক ও মূল দায়িত্ব দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলেরই।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার কট্টর ডানপন্থী বসতি স্থাপনকারী সমর্থকদের সমর্থন অক্ষুণ্ণ রাখতে নমনীয় নীতি অবলম্বন করছেন, যা পশ্চিম তীরে সহিংসতার মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়