আবুধাবিতে ব্যাটিং বিপর্যয়ে হার বাংলাদেশের, ব্যাটারদের দুষলেন তাসকিন
ফাইল ছবি
ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বোলিংয়ে দুর্দান্ত সূচনা করেও বড় হার এড়াতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষের ২৪ রানে ৩ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন পেসার তাসকিন আহমেদ। কিন্তু মাঝের ওভারে জিম্বাবুয়ের ঘুরে দাঁড়ানো এবং রান তাড়ায় বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ে শেষ পর্যন্ত ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে দলকে। আবুধাবির শেখ জায়েদ স্টেডিয়ামে এই হারের পর তাসকিনের কণ্ঠে ছিল হতাশা, ব্যাটারদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা এবং চাপের মুখে দলীয়ভাবে ভেঙে পড়ার প্রবণতা কাটিয়ে ওঠার তাগিদ।
শনিবারের (১৭ অক্টোবর) ম্যাচে টসের পর মাঠের লড়াইয়ে শুরুটা বাংলাদেশের পক্ষেই ছিল। তাসকিনের গতিময় বোলিংয়ে শুরুতেই তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে জিম্বাবুয়ে। তবে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে অধিনায়ক শন উইলিয়ামসের দল ঘুরে দাঁড়ায়। মাঝের ওভারে বড় জুটি গড়ে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২৭১ রান সংগ্রহ করে তারা। ফলে বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭২ রানের। ব্যাটিংয়ের জন্য সহায়ক উইকেটে এই লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের সম্ভাবনা দেখেছিলেন তাসকিন। কিন্তু উদ্বোধনী জুটির পর আর কোনো পর্যায়েই প্রত্যাশিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দলের ইনিংস।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তাসকিন বলেন, উইকেটের পরিস্থিতি বিবেচনায় জিম্বাবুয়ের দেওয়া লক্ষ্য বাংলাদেশের পক্ষে তাড়া করা সম্ভব ছিল।
তার মতে, বোলিংয়ের শুরুটা ভালো হলেও ব্যাটিংয়ে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি দল। তাসকিনের ভাষায়, জিম্বাবুয়ের সঙ্গে অন্তত ২৭০ অবশ্যই তাড়া করার মতো ছিল। এই কন্ডিশনে আমাদের আসলে তাড়া করা উচিত ছিল। আমরা আসলেই ভালো খেলিনি। ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে প্রতিপক্ষকে বড় সংগ্রহ গড়তে দেওয়া এবং পরে নিজেরা লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে থেমে যাওয়ার বিষয়টিকে তাই দলীয় ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন এই পেসার।
বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ের চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে জুটির পরিসংখ্যানে। সৌম্য সরকার ও তানজিদ হাসানের উদ্বোধনী জুটিতে আসে ৪৭ রান। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে বাংলাদেশ। ব্যাটারদের কেউই ইনিংসকে দীর্ঘ করার মতো দায়িত্ব নিতে পারেননি। নবম উইকেটে তাসকিন আহমেদ ও রিশাদ হোসেনের ২৬ বলে ৩২ রানের জুটিই ছিল শেষ দিকে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ। অথচ ইনিংসের মাঝামাঝি সময়ে একটি কার্যকর জুটি গড়ে তুলতে পারলে ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়া সম্ভব ছিল বলে মনে করেন তাসকিন।
তার মতে, ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকভাবে উইকেট হারানোই দলকে লড়াই থেকে ছিটকে দিয়েছে। বোলিংয়ে দলের সাম্প্রতিক উন্নতির কথাও তুলে ধরেছেন তাসকিন।
আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ার কাছে হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশ নারী দল
তার পর্যবেক্ষণ, বল হাতে আগের তুলনায় ধারাবাহিকতা কিছুটা বাড়লেও ব্যাটিংয়ে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই ম্যাচেও শুরুতে পাওয়া সুবিধা ধরে রাখা যায়নি, আবার রান তাড়ার সময়ও পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার অভাব দেখা গেছে।
তাসকিন বলেন, দুর্ভাগ্যবশত আমরা একটাও জুটি গড়তে পারিনি। একটা জুটি হলেই খেলাটা বের হয়ে যেত। বোলিংয়ে ধারাবাহিকতা আগের চেয়ে বেড়েছে। ব্যাটারদেরই আজ জেতানো উচিত ছিল, কিন্তু পারেনি।
ব্যাটারদের ব্যক্তিগত দক্ষতা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন তুলতে চান না বাংলাদেশের এই পেসার।
তার মতে, দলের প্রত্যেক ব্যাটারই অতীতে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। সমস্যা দক্ষতার অভাবে নয়; বরং চাপের মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝা এবং দলীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতায় ঘাটতি রয়েছে। প্রতিপক্ষ যখন চাপে থাকে, তখন সেই সুযোগ কাজে লাগানো কিংবা নিজেদের ওপর চাপ তৈরি হলে তা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও পরিণত হতে হবে।
তাসকিনের ভাষায়, স্কিল সবারই আছে। প্রতিটি ব্যাটার প্রমাণ করেছে, তারা ভালো ব্যাট করতে পারে। কিন্তু চাপের মুখে আমরা দল হিসেবে খুব দ্রুত ভেঙে পড়ি। এই জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
বড় দল হয়ে উঠতে হলে এই মানসিকতা পরিবর্তনের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তাসকিন। শুধু ব্যক্তিগতভাবে ভালো ইনিংস খেলার সামর্থ্য থাকলেই হয় না, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের ধরন বদলানো এবং উইকেট ধরে রেখে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ওয়ানডে ক্রিকেটে লক্ষ্য তাড়া করার সময় একের পর এক উইকেট হারালে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরির সুযোগ কমে যায়। বাংলাদেশের ব্যাটারদের বারবার একই ভুলে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি বুঝে খেলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে সতীর্থদের সমালোচনা করেই থেমে থাকেননি তাসকিন। ব্যাটাররা কঠোর পরিশ্রম করছেন বলে বিশ্বাস তার, আর ভুলগুলো দ্রুত শুধরে নিয়ে পরের ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশাও রয়েছে। জিম্বাবুয়ের কাছে এই হার বাংলাদেশের ফাইনালে ওঠার সমীকরণ কঠিন করে তুললেও এখনো আশা ছাড়ছেন না তিনি। সামনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে ভালো ক্রিকেট খেলে ফাইনালের লড়াইয়ে ফেরার লক্ষ্য বাংলাদেশের।
তাসকিনের মতে, শেষ ম্যাচে নিজেদের সামর্থ্যের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি চাপ সামলানোর জায়গায় উন্নতি করতে পারলেই ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য তাই কেবল একটি বড় পরাজয়ের গল্প নয়; বরং ভালো শুরুর পরও কীভাবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হয়, তারও পরীক্ষা। বোলিংয়ে পাওয়া প্রাথমিক সাফল্যকে কাজে লাগানো এবং ব্যাটিংয়ে প্রয়োজনীয় জুটি গড়ে লক্ষ্য তাড়া করার ব্যর্থতা আবারও দলের পুরোনো দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। এখন শেষ ম্যাচে সেই ভুলগুলো কাটিয়ে ওঠা এবং চাপের মধ্যে দায়িত্বশীল ক্রিকেট খেলাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








