মাদক অভিযানে ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শন, তদন্তে ডিএমপি
ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ঘটনায় আইন লঙ্ঘন বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে।
রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি পুলিশ খতিয়ে দেখছে। এ ক্ষেত্রে আইনগত কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। অনিয়ম কিংবা আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএমপির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অভিযানে একজন জনপ্রতিনিধির প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন ও প্রদর্শনের আইনগত বৈধতা, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটকের প্রক্রিয়া এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ও ঘুণ্টিঘর এলাকার রেললাইনসংলগ্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে মাদক কেনাবেচা চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা এ বিষয়ে একাধিকবার তার কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। তিনি পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন। এ পরিস্থিতিতে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তিনি অভিযানে অংশ নেন বলে জানান।
অভিযানের পর প্রতিমন্ত্রীর ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ শিরোনামের ওই ভিডিওতে তাকে গাড়ি থেকে নেমে হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চিৎকার করে এই ধর ধর ধর বলতে শোনা যায়। তার সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তিদেরও কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। ভিডিওর কিছু অংশে প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা পিস্তলের ছবি অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে অস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যক্তির হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ভিডিওটি তার ফেসবুক আইডি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর আরেকটি অংশে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় এক যুবককে নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে শোনা যায়। ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তিকে এক তরুণকে লাথি মারতেও দেখা যায়। অভিযানে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী ও সরকারি দেহরক্ষী উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজনের হাতে অস্ত্র ছিল। তবে ভিডিওতে দেখা ব্যক্তিদের ভূমিকা, অস্ত্র ব্যবহারের পরিস্থিতি এবং আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণের আইনগত দিক তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
আরও পড়ুন: দুর্গাপূজায় নিরাপত্তায় পুলিশের ৫ নির্দেশনা
অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, শনিবার বেলা ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে তারা ওই এলাকায় যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রতিমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন বলে তার দাবি। পুলিশকে আগেই জানানো হয়েছিল, তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন দাবি করেছেন, তার সঙ্গে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ। ওই এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটায় নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি অস্ত্রটি সঙ্গে রেখেছিলেন বলেও জানান।
তার ভাষ্য, অভিযানে অস্ত্রধারী পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি কাউকে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখাননি এবং কোনো গুলিও করেননি। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাই ছিল অভিযানের উদ্দেশ্য।
প্রতিমন্ত্রীর দাবি, গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ও ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদক কেনাবেচার বিষয়ে স্থানীয় লোকজন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন। বিষয়টি পুলিশকে জানানোর পরও প্রত্যাশিত ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি নিজেই অভিযানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানে অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর ভেঙে দেওয়া হয় এবং মাদক কারবারে জড়িত সন্দেহে ছয়জনকে আটক করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা এবং অভিযানে অনুসৃত প্রক্রিয়ার আইনগত বৈধতা তদন্তসাপেক্ষ।
ঘটনাটি ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক হলেও একজন জনপ্রতিনিধি কোন পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে জনসমক্ষে সেই অস্ত্র বহন বা প্রদর্শন করতে পারেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র-সংক্রান্ত নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বৈধ অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নীতিমালা অনুযায়ী, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে বৈধ অস্ত্র বহন বা ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মধ্যে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি হয় এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। ফলে অস্ত্রটির লাইসেন্স বৈধ কি না, তার পাশাপাশি অভিযানের সময় অস্ত্র প্রদর্শনের পরিস্থিতি ও উদ্দেশ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকার অপরাধ দমনে উদ্যোগ নিতে পারেন; তবে অপরাধের অভিযোগে কাউকে আটক করা, বলপ্রয়োগ করা কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান অনুসরণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে আচরণ এবং অস্ত্র প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
ডিএমপির তদন্তে এখন মূলত খতিয়ে দেখা হবে, অভিযানের সময় প্রতিমন্ত্রী ও তার সহযোগীদের অস্ত্র বহন বা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বিধিনিষেধ লঙ্ঘিত হয়েছে কি না। পাশাপাশি ঘটনাটির পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায় কি না, তা তদন্তের ফলাফলের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি








