নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১২:৪৩, ২১ অক্টোবর ২০২৬

১৮ বছরের আগেই হচ্ছে ৪৭.২ শতাংশ নারীর বিয়ে: ইউনিসেফ

১৮ বছরের আগেই হচ্ছে ৪৭.২ শতাংশ নারীর বিয়ে: ইউনিসেফ

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় অর্ধেকেরই বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। তাদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই। বাল্যবিবাহের এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য তুলে ধরা হয়। 

এতে বলা হয়েছে, দেশে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। বাল্যবিবাহের এ প্রবণতা মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত বিকাশ এবং ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগকেও বাধাগ্রস্ত করছে। 

ইউনিসেফের মতে, অল্প বয়সে বিয়ের ফলে মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে, তৈরি হয় অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের জীবনযাত্রা ও সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বাংলাদেশে তিন দিনের সফর শেষে শিশুদের সুরক্ষা ও কল্যাণে তিনটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল। 

তার প্রস্তাবের প্রথমটি হলো, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সরকারি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। 

সংস্থাটি মনে করে, মেয়েদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার পরিবেশ তৈরি করা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহের সুযোগ তৈরি করে এমন আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করা এ সমস্যা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ সফরকালে ঢাকার কড়াইল বস্তির বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন ক্যাথরিন রাসেল। এ ছাড়া কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের বাস্তবতা সম্পর্কে জানেন তিনি। 

বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা পাওয়া ১৪ বছর বয়সী বুশরার সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাসেল জানান, ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের কমিউনিটি নেতারা বুশরার বাবাকে সঙ্গে নিয়ে তাকে বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করেন। 

আরও পড়ুন: শিশুদের ওপর বর্বরতা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে : ইউনিসেফ

এই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা এবং তাদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, তাদের পরিবার, কমিউনিটি ও বাংলাদেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

ঢাকা সফরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক। এ সময় শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সরকারি অঙ্গীকারের প্রশংসা করার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি। 

রাসেল বলেন, বাজেটের মধ্য দিয়েই একটি দেশের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হয়। শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও সুরক্ষায় বিনিয়োগকে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেন। 

ইউনিসেফের দৃষ্টিতে, শিশুদের মৌলিক সেবায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে তাদের বিকাশের সুযোগ বাড়বে এবং দারিদ্র্য ও বঞ্চনার কারণে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে।

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষার বিষয়টিও রাসেলের সফরে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি শিক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে শোনেন। 

রাসেল বলেন, সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গা শিশুরা ইতোমধ্যে অনেক কিছু হারিয়েছে; তাদের যেন শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হতে না হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শরণার্থী শিশুদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্যও বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

ইউনিসেফের মতে, শিক্ষার সুযোগ শিশুদের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পথ তৈরি করার পাশাপাশি শোষণ, পাচার, বাল্যবিবাহ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগের মতো ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায়ও সহায়তা করে। কক্সবাজারে সংস্থাটি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অপুষ্টি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, শিশু সুরক্ষা এবং মানসিক সহায়তাসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা দিয়ে থাকে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করা হয়। তবে মানবিক সহায়তার তহবিল কমে যাওয়ায় এসব সেবা সচল রাখা এবং শিশুদের জন্য অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর শিশুদের শিক্ষা ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক সহায়তা জরুরি।

বাংলাদেশে শিশু ও পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে ইউনিসেফ। মানসম্মত শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পুষ্টি, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন এবং শিশু সুরক্ষা সেবা সম্প্রসারণে সহায়তার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ ও শিশুনির্যাতন প্রতিরোধ, কিশোরীদের ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারেও কাজ করছে সংস্থাটি। তবে বাল্যবিবাহের উচ্চ হার এবং শরণার্থী শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতিগত অঙ্গীকারের পাশাপাশি কার্যকর উদ্যোগ ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। 
ইউনিসেফের আহ্বান, শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সূত্র: ইউনিসেফ

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়