নিউজ ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০৮:৫৮, ১ অক্টোবর ২০২৬

সেপ্টেম্বরে ৭১ অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, হেফাজতে মৃত্যু ২৪

সেপ্টেম্বরে ৭১ অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার, হেফাজতে মৃত্যু ২৪

ফাইল ছবি

সেপ্টেম্বর মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিতে একদিকে কিছু ধরনের প্রকাশ্য সহিংসতা কমলেও অন্যদিকে মব সহিংসতা, কারা হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক সংঘাত, অজ্ঞাতনামা মরদেহ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার বেশ কিছু সূচকে উদ্বেগ বেড়েছে। 

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সেপ্টেম্বর মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটি।

এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মব সহিংসতার অন্তত ৬৫টি ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন। চুরি, ডাকাতি, জমি ও অর্থনৈতিক বিরোধ, বাকবিতণ্ডা এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ ধরনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো ঘটেছে। আগস্টের তুলনায় মব সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা কমলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকাকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। তবে প্রতিবেদনের বিভিন্ন সংবাদ-সারাংশে আগস্টের মব সহিংসতার ঘটনা ৩৫টি এবং সেপ্টেম্বরে ২৩টি এমন একটি আলাদা তুলনামূলক হিসাবও উল্লেখ করা হয়েছে; এটি মব সহিংসতার ঘটনায় ব্যবহৃত আরেকটি গণনাপদ্ধতি, আর ৬৫টি হলো এমএসএফের নথিভুক্ত মব সহিংসতার মোট ঘটনা হিসেবে প্রকাশিত সংখ্যা।

মব সহিংসতার বিপরীতে কারা হেফাজতে মৃত্যুর চিত্র সেপ্টেম্বরে আরও প্রকট হয়েছে। আগস্টে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯; সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে। অর্থাৎ এক মাসে এই সংখ্যা ১৫ জন বেড়েছে এবং দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। প্রকাশিত এমএসএফ-তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে কারা হেফাজতে মারা যাওয়া ব্যক্তিরা সবাই পুরুষ হাজতি ও কয়েদি। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে একজন নারীর মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে এমএসএফ। সংস্থাটি বলেছে, এসব ঘটনা বন্দিদের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানবিক আচরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।

অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যাও সেপ্টেম্বরে উল্লেখযোগ্য। এমএসএফের হিসাবে, মাসটিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৫ জন পুরুষ, ১৫ জন নারী এবং একজনের বয়স ও লিঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মরদেহ নদী, সড়ক, রেললাইন, ফসলি জমি কিংবা পরিত্যক্ত স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কয়েকটি মরদেহ গলা কাটা, বস্তাবন্দি, হাত-পা বাঁধা ও রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রেও সেপ্টেম্বরের চিত্র পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। এমএসএফ জানিয়েছে, মাসটিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩৮৪ জন আহত এবং অন্তত একজন নিহত হয়েছেন। এর বাইরে অজ্ঞাতনামা হামলায় আরও সাতজন নিহত হয়েছেন। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক পরিবেশের অস্থিরতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: রাড্ডা ভাঙচুর-জবরদখল সরকারের জন্য অশনিসংকেত: টিআইবি

সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও দ্বিমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এমএসএফের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে ২৮ জন সাংবাদিক হামলা বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৯ জন আইনি হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। শারীরিক হামলা কিছুটা কমলেও আইনি হয়রানি বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সময়ে ডিজিটাল বা সাইবার আইনে মামলা আগস্টের ৩টি থেকে বেড়ে সেপ্টেম্বরে ৮টি হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যাও ৩ থেকে বেড়ে ৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এমএসএফের মতে, এই প্রবণতা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও সেপ্টেম্বর মাসে নতুন করে উদ্বেগের তথ্য দিয়েছে এমএসএফ। সংস্থাটির হিসাবে, আগস্টে একটি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা নথিভুক্ত হলেও সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন স্থানে এ সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১০টিতে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি একটি জাতিগত নির্যাতনের ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে কুষ্টিয়ার হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে গরুর মাংস রান্না করে পিকনিক করার অভিযোগ এবং শ্মশানের চিতা ও সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। 

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি নিয়ে পরে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ ও উত্তেজনাও তৈরি হয় এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পরিসংখ্যানও সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। এমএসএফের হিসাবে, আগস্টে এ ধরনের নথিভুক্ত ঘটনা ছিল ৩২৭টি; সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৩৫৪টি অর্থাৎ এক মাসে ২৭টি বা প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি। গুরুতর কয়েকটি সূচকে বৃদ্ধিও দেখা গেছে। ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ৫টি থেকে বেড়ে ১০টি, ধর্ষণচেষ্টা ২১ থেকে ৩৬টি, শারীরিক নির্যাতন ৪০ থেকে ৫২টি এবং অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা ১৪ থেকে ২৭টিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা ৭০ থেকে সামান্য কমে ৬৯টি, যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি ২২ থেকে কমে ১৬টি, আত্মহত্যা ৩৯ থেকে ৩৫টি এবং হত্যার ঘটনা ৯১ থেকে ৮০টিতে নেমেছে। দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে উভয় মাসেই ১২টি করে ছিল।

নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি উদ্বেগজনক সূচক হলো নবজাতক পরিত্যাগের ঘটনা। এমএসএফের হিসাবে, আগস্টে তিনটি নবজাতক উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেলেও সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯টিতে। এর মধ্যে বরিশালে দুটি, নোয়াখালীতে একটি, ঢাকায় তিনটি এবং বগুড়ায় তিনটি নবজাতক উদ্ধারের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতিও সেপ্টেম্বরের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে স্থান পেয়েছে। 

এমএসএফ জানিয়েছে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়া, আটক এবং সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো বা পুশইনের চেষ্টার ঘটনাগুলো তারা পর্যবেক্ষণ করেছে। পাশাপাশি মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে একজন বাংলাদেশি আহত হওয়ার ঘটনাও প্রতিবেদনে এসেছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি টেকনাফের নাফ নদীর মিয়ানমার জলসীমায় মাছ ধরার সময় মো. ইদ্রিস (৫৫) নামে এক বাংলাদেশি জেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়ার খবর স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।

সব মিলিয়ে এমএসএফের সেপ্টেম্বরের পর্যবেক্ষণে মানবাধিকার পরিস্থিতিকে একক কোনো প্রবণতায় ব্যাখ্যা করা হয়নি। প্রকাশ্য সহিংসতার কিছু সূচকে পরিবর্তন বা হ্রাস দেখা গেলেও কারা হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক সংঘাতে আহত, মবের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ, সাইবার আইনে মামলা ও গ্রেফতার, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে কয়েক ধরনের গুরুতর সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। 

সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জবাবদিহিতা, বিচারিক সুরক্ষা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়