আন্তর্জাতিক ডেস্ক || নিউজবাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২০:৪৮, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন ভোটারদের ট্রাম্পের নীতি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান আইআরজিসির

মার্কিন ভোটারদের ট্রাম্পের নীতি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান আইআরজিসির

ছবি: সংগৃহীত

আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও মিত্রদের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়ে মার্কিন ভোটারদের প্রতি একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাক থেকে নিজেদের শেষ সামরিক ঘাঁটি গুটিয়ে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। 

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি মার্কিন নাগরিকদের উদ্দেশে ২৬ বা ২৫ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত খোলা চিঠি প্রকাশ করে। চিঠিতে মার্কিন ভোটারদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে কংগ্রেস থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মিত্র ও সমর্থকদের ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তনের ডাক: চিঠিতে মার্কিন প্রশাসনকে তীব্র সমালোচনা করে বলা হয়েছে, আমেরিকার বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের জন্য দায়ী দুষ্ট, প্রতারক ও সহিংস রাজনীতিকদের ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিতে হবে। 

ইসরায়েল ও সামরিক নীতির বিরোধিতা: ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন একতরফা সমর্থন এবং বিদেশে অপ্রয়োজনীয় সামরিক হস্তক্ষেপ ও যুদ্ধনীতি প্রত্যাখ্যান করার জন্য মার্কিন ভোটারদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেছেন যে, এই চিঠিটি সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের আচরণ রাতারাতি বদলে দেবে এমন অবাস্তব প্রত্যাশা তাদের নেই। 

তবে মার্কিন জনগণ মূল সত্য ও ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলো সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বিস্তারিত তথ্য জানতে পারলে ভোটাররা ভিন্নভাবে চিন্তা করতে বাধ্য হবেন। 

খোলা চিঠিতে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক কর্মসূচির শান্তিপূর্ণ রূপ এবং পারস্য উপসাগরে ইরানের তেল রফতানি নিয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগ তোলা হয়েছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না এবং মার্কিন নেতৃত্ব এই সত্যটি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন করছে।

অন্যদিকে, সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে তিনি চাইলে ইরানকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। 

এর জবাবে আইআরজিসি কড়া ভাষায় জানিয়েছে যে, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জীবন এমন একজন নেতার হাতে ন্যস্ত যিনি কেবল রাজনৈতিকভাবে অসত্ই নন, বরং ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সম্পদের লোভে অন্ধ। 

আরও পড়ুন: ২৩ বছর পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনারা

এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে তেল রফতানি সুরক্ষার দাবিকেও চ্যালেঞ্জ করেছে তেহরান। তাদের মতে, উচ্চ খরচ ও চরম ঝূঁকি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি ছোট জাহাজে তেল পারাপার করার মানে এই নয় যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে উন্মুক্ত ও নিরাপদ।

আইআরজিসির এই রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গেই কাকতালীয় বা কৌশলগতভাবে মিলে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি বড় ঘটনা। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া মার্কিন সামরিক উপস্থিতির দীর্ঘ ২৩ বছরের অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ইরাকের শেষ ঘাঁটিগুলো থেকেও সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে ওয়াশিংটন।

ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর এই প্রস্থানকে তেহরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের এক বিরাট ভূরাজনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন শূন্যতার সুযোগ নিয়ে ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী ও তেহরানের রাজনৈতিক প্রভাব আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এদিকে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দল রিপাবলিকান পার্টি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। 

সাম্প্রতিক রয়টার্স/ইপসোসের জনমত জরিপ অনুযায়ী, ইরানে সামরিক হামলাকে সমর্থন করছেন মাত্র ৩৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। অন্যদিকে, লাগামহীন যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ফলে মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের উদ্যোগকে সমর্থন দিচ্ছেন, যা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি কংগ্রেসের উভয় কক্ষে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে মুখিয়ে আছে, যা ট্রাম্পের নীতি বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই বহুমুখী সংকটের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাত মাসের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের তীব্রতা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে কাতার। কাতার সরকারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চলছে। 

ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত হিসেবে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার একটি প্রস্তাবের জবাব ওয়াশিংটনের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে, ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং আইআরজিসির সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা ওয়াশিংটন-তেহরান সংঘাতে এক নতুন ও জটিল মাত্রা যোগ করেছে।  

নিউজবাংলাদেশ.কম/পলি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়